ক.
নারী ও পুরুষ সম্বন্ধীয় মনস্তাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিকবোধ হচ্ছে জেন্ডার।
খ.
সমাজের দুই বা ততোধিক গোষ্ঠীর মধ্যে মর্যাদা, ক্ষমতা, সুযোগ-সুবিধা, দান-অনুদান, বিধিনিষেধ বা অন্যান্য সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে যে পার্থক্য দেখা যায় তাকেই সামাজিক অসমতা বলে।
সামাজিক অসমতা মূলত মানুষের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্যমূলক অবস্থাকে নির্দেশ করে। এটি জন্মগত বা প্রাকৃতিক কারণে হতে পারে, আবার সমাজ কর্তৃক সৃষ্টও হতে পারে। সম্পদ, শিক্ষা, বংশমর্যাদা এবং ক্ষমতার অসম বণ্টনের ফলে সমাজে উঁচু-নিচু ভেদাভেদ তৈরি হয়, যা সামাজিক স্থিতিশীলতাকে ব্যাহত করে।
গ.
উদ্দীপকে উল্লেখিত বিষয়টি বয়স বৈষম্যবাদকে নির্দেশ করে।
বয়স বৈষম্যবাদ বলতে বয়সের কারণে কোনো বয়সগোষ্ঠী বা তার কোনো সদস্যদের প্রতি নেতিবাচক ধ্যান-ধারণা বা মনোভাব পোষণ ও তার সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করাকে বোঝায়। বয়স বিদ্বেষী ব্যক্তি বা সমাজ প্রবীণকে জৈবিক ও সামাজিকভাবে অযোগ্য বলে মনে করে। আবার অনেকসময় বয়সে নবীণের প্রতিও এ ধরনের মনোভাব পোষণ করা হয়। তবে সাধারণত প্রবীণের প্রতিই বয়স বৈষম্যমূলক মনোভাব বেশি পরিলক্ষিত হয়। পৃথিবীর অধিকাংশ সমাজেই প্রবীণরা কম-বেশি বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হন। আমেরিকান চিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞানী রবার্ট বাটলার বলেন, "বয়স বৈষম্যবাদকে এমন একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয় যার মাধ্যমে বয়সের কারণে প্রবীণের প্রতি বদ্ধমূল ধারণা পোষণ ও বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়।" যেমনটি উদ্দীপকের ঘটনায় প্রতিফলিত হয়েছে।
উদ্দীপকে দেখা যায়, সুমন সাহেবের ছেলে-মেয়েরা সবাই উচ্চশিক্ষিত ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত। ছেলেমেয়েরা সুমন সাহেবের প্রতি যত্নবান নয় এবং পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার সাথে পরামর্শ করেন না। তাদের ধারণা, বয়সের কারণে সুমন সাহেবের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অক্ষম। বস্তুত সুমন সাহেবের বয়সকে কেন্দ্র করেই তার সন্তানরা তাকে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে উপেক্ষা করে এবং তার সক্ষমতা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে। সুতরাং বলা যায়, সুমন সাহেবের প্রতি এ ধরনের মনোভাব বয়স বৈষম্যবাদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
ঘ.
উদ্দীপকে বর্ণিত প্রবীণদের প্রতি বৈষম্য দূরীকরণে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় ও পারিবারিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য বলে আমি মনে করি।
প্রবীণরা সমাজের অভিজ্ঞ ও সম্মানিত অংশ। কিন্তু আধুনিক শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার গঠিত হওয়ায় প্রবীণরা একাকীত্ব ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অর্থনৈতিক পরনির্ভরশীলতা এবং শারীরিক অসুস্থতা তাদের এই বৈষম্যের শিকার হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। ফলে তারা পরিবারে ও সমাজে তাদের প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত হন।
উদ্দীপকের সুমন সাহেব তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ও সম্পদ পরিবারের জন্য ব্যয় করলেও বার্ধক্যে তিনি অবহেলিত। এই চিত্রটি বর্তমান সমাজের অনেক প্রবীণ ব্যক্তির জীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। পরিবারের সদস্যদের নৈতিক অবক্ষয় এবং প্রবীণদের প্রতি সহমর্মিতার অভাবই এই বৈষম্যকে প্রকট করে তোলে। সুমন সাহেবের মতো প্রবীণদের এই করুণ দশা থেকে মুক্তি দিতে হলে সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রবীণদের প্রতি করা বৈষম্য দূর করতে হলে প্রথমে পারিবারিক পর্যায়ে নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে, যাতে সন্তানরা তাদের বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্বশীল হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে 'পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন' এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া প্রবীণদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী জোরদার করা, যেমন- বয়স্ক ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি এবং বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা প্রয়োজন। সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা এবং প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি করলে তারা আর সমাজের বোঝা হিসেবে গণ্য হবেন না। সর্বোপরি প্রবীণদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনই এই বৈষম্য দূর করার প্রধান উপায়।