ক.
মুক্তিযুদ্ধের সময় সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
খ.
মুক্তিযুদ্ধে ১১টি সেক্টরের বাইরে আঞ্চলিক পর্যায়ে যেসব বাহিনী গড়ে ওঠে সেগুলোকে এক কথায় মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা বাহিনী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গেরিলা বাহিনীর মধ্যে টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনী, ময়মনসিংহের আফসার ব্যাটালিয়ন বাহিনী, সুন্দরবনের জিয়া বাহিনী অন্যতম। এছাড়াও ঢাকা শহরের গেরিলা বাহিনীর নাম ছিল। ক্রাক প্লাটুন। এসব গেরিলা বাহিনী সার্বক্ষণিকভাবে চোরাগুপ্তা হামলার মাধ্যমে পাকবাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে।
গ.
উদ্দীপকে দেখানো ঘটনার সাথে পাঠ্যবইয়ের মুক্তিযুদ্ধের নিয়মিত ও অনিয়মিত বাহিনীর প্রতিষ্ঠার ঘটনার সাথে মিল আছে।
মুক্তিবাহিনী সরকারি পর্যায়ে দুটি শাখায় বিভক্ত ছিল- ১. নিয়মিত বাহিনী ও ২. অনিয়মিত বাহিনী।
১. নিয়মিত বাহিনী : ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইউনিটগুলোর বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে এ বাহিনী গঠিত হয়। সরকারিভাবে এদের নামকরণ করা হয় এম. এফ. (মুক্তিফৌজ)। মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশ সরকার নিয়মিত বাহিনী হিসেবে সেনাবাহিনী, বিমান ও নৌবাহিনীও গড়ে তোলে।
২. অনিয়মিত বাহিনী : ছাত্র, যুবক, শ্রমিক, কৃষক ও সকল পর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বিভিন্ন সেক্টরের অধীনে অনিয়মিত বাহিনী গঠিত হয়। এ বাহিনীর সরকারি নামকরণ ছিল 'গণবাহিনী' বা এফ. এফ. (ফ্রিডম ফাইটার বা মুক্তিযোদ্ধা)। তাদের নিজ নিজ এলাকায় গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ করার জন্য প্রেরণ করা হতো। এছাড়া ছাত্রলীগের বাছাইকৃত কর্মীদের নিয়ে গঠিত হয় মুজিববাহিনী।' কমিউনিস্ট পার্টি ন্যাপ (মোজাফফর), ন্যাপ (ভাসানী) ও ছাত্র ইউনিয়নের আলাদা গেরিলা দল ছিল।
সেক্টর এলাকার বাইরে আঞ্চলিক পর্যায়ে যেসব বাহিনী গড়ে ওঠে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে— কাদেরিয়া বাহিনী (টাঙ্গাইল), আফসার ব্যাটালিয়ন (ভালুকা, ময়মনসিংহ), বাতেন বাহিনী (টাঙ্গাইল), হেমায়েত বাহিনী (গোপালগঞ্জ, বরিশাল), হালিম বাহিনী (মানিকগঞ্জ), আকবর বাহিনী (মাগুরা), লতিফ মীর্জা বাহিনী (সিরাজগঞ্জ, পাবনা) ও জিয়া বাহিনী (সুন্দরবন)। এছাড়া ছিল ঢাকার গেরিলা দল, যা ক্রাক প্লাটুন' নামে পরিচিত। ঢাকা শহরের বড় বড় স্থাপনা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, হোটেল শেরাটন (পূর্বের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল), ব্যাংক ও টেলিভিশন ভবনে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় ঢাকার গেরিলারা। এভাবে তারা পাকিস্তানি সেনা ও সরকারের মধ্যে ত্রাসের সঞ্চার করে।
ঘ.
উদ্দীপকে বিভিন্ন বাহিনী যেভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করেছে, একইভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যৌথ বাহিনীও বীর বিক্রমে যুদ্ধ পরিচালনা করে।
নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিচ্ছিন্নভাবে প্রবেশ করতে থাকে। ১৩ নভেম্বর ট্যাংকসহ দুই ব্যাটালিয়ন ভারতীয় সৈন্য যশোরে ঘাঁটি স্থাপন করে। পাকিস্তান বাহিনী ১৯ নভেম্বর তাদের বিরুদ্ধে আকাশ অভিযান করলেও বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি। ২১ নভেম্বরও পাকিস্তান বাহিনী ব্যর্থ হয় এবং ৩ ডিসেম্বরের পূর্ব পর্যন্ত তারা আক্রমণের সাহস পায়নি। ২১ নভেম্বর বাংলাদেশ ও ভারত সরকার মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ কমান্ড গঠন করে।
স্থলবাহিনী ছাড়াও ভারতীয় বিমান, নৌ ও যুদ্ধজাহাজ এর অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় যুদ্ধে ক্ষিপ্রতা লাভ করে। যৌথ কমান্ড গঠনের পর ২৩ নভেম্বর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জরুরি অবস্থা জারি করেন। তিনি বক্তৃতায় বলেন, ‘পাকিস্তান বৈদেশিক আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছে এবং দেশে জরুরি অবস্থা বিরাজ করছে।' তিনি বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের উপমহাদেশের পরিস্থিতি জানিয়ে জরুরি বার্তা পাঠান। ২৫ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট যেকোনো সময় বড় ধরনের যুদ্ধের ইঙ্গিত দেন ৷
এরূপ অবস্থায় ৩ ডিসেম্বর ভারতীয় বিভিন্ন বিমানঘাঁটিতে পাকিস্তানি বিমানবাহিনী অতর্কিতে হামলা চালালে শুরু হয় সর্বাত্মক যুদ্ধ। যৌথ কমান্ডের বাংলাদেশ সীমান্তে আক্রমণের পাশাপাশি চালানো হয় বিমান হামলা। ওই দিনই পাকিস্তান বাহিনীর ৩টি মিরেজ, ২টি এফ-১০৪ স্টাফ ফাইটারসহ ৩৩টি বিমান ভূপাতিত হয়। পূর্ব সীমান্তে কামালপুর ঘাঁটির পতন ঘটানোসহ চট্টগ্রাম, কক্সবাজারের ওপর মিত্রবাহিনীর নৌবহর প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। প্রথম থেকেই যৌথ বাহিনীর লক্ষ্য ছিল ঢাকা দখল করে পাকিস্তান বাহিনীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা।
তাই বলা যায়, উদ্দীপকের নিয়মিত ও অনিয়মিত বাহিনীর মতো যৌথবাহিনীও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ফলে বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয় সুনিশ্চিত হয়।