(ক)
কাঁচামাল বা প্রাথমিক দ্রব্যকে কারখানাভিত্তিক উৎপাদন প্রণালির মাধ্যমে মাধ্যমিক বা চূড়ান্ত দ্রব্যে রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে শিল্প বলা হয়।
(খ)
ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প উভয়ই ক্ষুদ্রায়তনের শিল্প হলেও এদের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান।
ক্ষুদ্র শিল্পে স্থায়ী সম্পদের পরিমাণ (জমিসহ) সাধারণত ১০ লক্ষ টাকা থেকে ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে এবং শ্রমিকের সংখ্যা ২৫ থেকে ৯৯ জন পর্যন্ত হয়। অন্যদিকে, কুটিরশিল্প আরও ছোট আকারের হয়, যেখানে স্থায়ী সম্পদের পরিমাণ সাধারণত ১০ লক্ষ টাকার কম এবং এটি প্রধানত পারিবারিক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল থাকে। ক্ষুদ্র শিল্পে যন্ত্রপাতির ব্যবহার তুলনামূলক বেশি হলেও কুটির শিল্পে হস্তচালিত যন্ত্র বা সহজ প্রযুক্তির ব্যবহার বেশি দেখা যায়।
(গ)
উদ্দীপকের তথ্য অনুসারে, শফিকের পরিবারের উদ্যোগে পরিচালিত শিল্পটি কুটিরশিল্পের অন্তর্ভুক্ত।
কুটিরশিল্প এমন এক ধরনের ক্ষুদ্র শিল্প, যেখানে পরিবারভিত্তিক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সাধারণত এই শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার কম এবং উৎপাদিত পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়। নিচে কুটিরশিল্পের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হলো:
১. পরিবারভিত্তিক উৎপাদন: কুটিরশিল্পে প্রধানত পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে কাজ করেন এবং উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
২. স্বল্প মূলধনের ব্যবহার: কুটিরশিল্প পরিচালনার জন্য বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন হয় না, স্বল্প মূলধনেই উৎপাদন সম্ভব হয়।
৩. স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার: এই শিল্পে স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়, যা উৎপাদন খরচ কমায়।
৪. শ্রমনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা: এখানে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার সীমিত এবং উৎপাদন প্রধানত হাতে বা প্রাথমিক পর্যায়ের যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
উদ্দীপকে দেখা যায়, শফিক পরিবারভিত্তিক শ্রমের মাধ্যমে তাঁতের লুঙ্গি, গামছা, রুমাল, মাফলার এবং বাঁশ-বেতের পণ্য উৎপাদন করেন, যা কুটিরশিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাছাড়া উৎপাদন খরচ কম এবং স্বল্প মূলধনে তিনি এই শিল্প পরিচালনা করছেন। এসব বৈশিষ্ট্যের সাথে মিল থাকায় এটি কুটিরশিল্পের অন্তর্ভুক্ত।
(ঘ)
উদ্দীপকে বর্ণিত শিল্পটির নাম কুটিরশিল্প।
কুটিরশিল্প বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাত, যা গ্রামীণ অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এই শিল্পের বিকাশে বেশ কিছু সমস্যা বিদ্যমান, যা এর সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করছে। কুটিরশিল্পে বিদ্যমান প্রধান সমস্যাসমূহ হলো:
১. মূলধনের অভাব: বেশিরভাগ কুটিরশিল্প উদ্যোক্তার পর্যাপ্ত মূলধন নেই, ফলে তারা উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে পারে না।
২. আধুনিক প্রযুক্তির অভাব: কুটিরশিল্পে সাধারণত আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার কম হয়, ফলে উৎপাদন ব্যয় বেশি এবং উৎপাদনশীলতা তুলনামূলক কম থাকে।
৩. বাজারজাতকরণ সমস্যা: অনেক ক্ষেত্রেই কুটিরশিল্পের উদ্যোক্তারা তাদের উৎপাদিত পণ্যের জন্য উপযুক্ত বাজার খুঁজে পান না, যার ফলে তারা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন।
৪. প্রতিযোগিতামূলক বাজার: আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বৃহৎ শিল্পগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কুটিরশিল্পের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ তাদের উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক বেশি হয়।
৫. কাঁচামালের অপ্রতুলতা ও উচ্চমূল্য: বাঁশ, বেত, তাঁতের সুতা ইত্যাদির দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকট কুটিরশিল্পের উৎপাদনশীলতায় প্রভাব ফেলে।
৬. দক্ষ শ্রমিকের অভাব: প্রচলিত কুটিরশিল্পে দক্ষ জনবল গড়ে ওঠার সুযোগ কম, ফলে অনেক ক্ষেত্রেই মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন সম্ভব হয় না।
সুতরাং, কুটিরশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও মূলধনের অভাব, প্রযুক্তিগত দুর্বলতা, বাজারজাতকরণের সমস্যা, কাঁচামালের সংকট এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারের চাপে এটি অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে।