(ক)
আর্কিওপটেরিক্স (Archaeopteryx) হলো একটি বিবর্তনিক সংযোগকারী জীবাশ্ম (connecting link fossil), যাতে সরীসৃপ ও পাখি উভয় শ্রেণির বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় ঘটেছে।
(খ)
প্রাণিদেহে এমন কিছু অঙ্গ থাকে যা পূর্বপুরুষে সক্রিয় থাকলেও বর্তমানে অকেজো বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে। এসব অঙ্গকে নিষ্ক্রিয় অঙ্গ (vestigial organ) বলা হয়। মানুষের চোখের ভেতরের কোণে অবস্থিত উপপল্লব বা নিকটিটেটিং মেমব্রেন (nictitating membrane) মানুষের দেহে সম্পূর্ণ অকেজো এবং এর কোনো কাজ নেই। কিন্তু অন্যান্য অনেক মেরুদণ্ডী প্রাণীতে (যেমন- পাখি, ব্যাঙ) এটি সক্রিয় থাকে। মানুষের দেহে এটি অকেজো বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকায় একে নিষ্ক্রিয় অঙ্গ বলা হয়।
(গ)
উদ্দীপকে লিমার দেখা জীবন্ত প্রাণীটি হলো জিরাফ। জিরাফের লম্বা গলা ও বিশেষ দৈহিক গঠন বিবর্তনের আলোকে ল্যামার্কের (Lamarck) মতবাদ বা ল্যামার্কবাদের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যায়।
ল্যামার্কের মতবাদ অনুযায়ী, জিরাফের আদি পূর্বপুরুষদের গলা ও সামনের পা বর্তমানের ঘোড়ার মতো খাটো ছিল। তারা মাটিতে জন্মানো ঘাস বা ছোট ছোট গাছপালা খেয়ে জীবন ধারণ করত। কিন্তু কালক্রমে প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলে চারণভূমিতে ঘাস ও ছোট উদ্ভিদের অভাব দেখা দেয়। তখন বেঁচে থাকার তাগিদে তারা গাছের উঁচু ডালপালার পাতা খেতে শুরু করে।
উঁচু ডালপালা থেকে পাতা খাওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত ঘাড় ও সামনের পা প্রসারিত করার চেষ্টা করার ফলে বংশপরম্পরায় এদের গলার দৈর্ঘ্য ও সামনের পা একটু করে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ল্যামার্কের মতবাদের মূল চারটি সূত্র এক্ষেত্রে কাজ করেছে:
১. অন্তঃজীবনী শক্তি বা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবণতা: জীবনধারণের তাগিদে জীবের আকার ও অঙ্গের বৃদ্ধি ঘটে।
২. পরিবেশের প্রভাব এবং নতুন চাহিদার সৃষ্টি: পরিবেশের পরিবর্তনের ফলে জীবের নতুন চাহিদার সৃষ্টি হয়।
৩. অঙ্গের ব্যবহার ও অব্যবহারের সূত্র: কোনো অঙ্গের ক্রমাগত ব্যবহারের ফলে তা সুগঠিত ও সবল হয়, আর অব্যবহারের ফলে তা নিষ্ক্রিয় বা বিলুপ্ত হয়ে যায়। জিরাফের ক্ষেত্রে গলার ক্রমাগত ব্যবহারের ফলে তা লম্বা হয়েছে।
৪. অর্জিত বৈশিষ্ট্যের বংশানুসরণ: জীবদ্দশায় অর্জিত বৈশিষ্ট্যসমূহ পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়।
এভাবে বহু প্রজন্ম ধরে অর্জিত বৈশিষ্ট্যের সঞ্চারণের ফলে খাটো গ্রীবাবিশিষ্ট আদি পূর্বপুরুষ থেকে বর্তমানের লম্বা গলাবিশিষ্ট জিরাফের উদ্ভব হয়েছে।
(ঘ)
উদ্দীপকে লিমার না দেখা প্রাণীটি হলো ডাইনোসর। ডাইনোসরের অস্তিত্ব প্রমাণে জৈব অভিব্যক্তির জীবাশ্মঘটিত বা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ (Palaeontological evidence) সবচেয়ে বেশি যুক্তিযুক্ত।
বিবর্তনের সপক্ষে যত প্রমাণ রয়েছে, তার মধ্যে জীবাশ্মঘটিত প্রমাণকে সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হয়। ভূগর্ভের শিলাস্তরে সংরক্ষিত প্রাচীনকালের জীবের কোনো অংশ, কঙ্কাল, ছাপ বা পদচিহ্নকে জীবাশ্ম বা ফসিল (Fossil) বলে।
ডাইনোসরের অস্তিত্ব এবং তাদের বিলুপ্তির ইতিহাস মূলত জীবাশ্মের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া সরীসৃপ ও পাখির মধ্যবর্তী সংযোগকারী জীব হিসেবে জার্মানির ব্যাভেরিয়ায় আবিষ্কৃত আর্কিওপটেরিক্স (Archaeopteryx)-এর জীবাশ্ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আর্কিওপটেরিক্সের জীবাশ্মে সরীসৃপ ও পাখি উভয়ের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল:
সরীসৃপের বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. চোয়ালে তীক্ষ্ণ ও ধারালো দাঁত।
২. ডানার অগ্রভাগে নখরযুক্ত তিনটি আঙুল।
৩. লম্বা ও অস্থিময় লেজ।
৪. বুক কীলবিহীন (keelless sternum) এবং অস্থিগুলো নিরেট।
পাখির বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. দেহ পালক দ্বারা আবৃত।
২. অগ্রপদ ডানায় রূপান্তরিত।
৩. চোয়াল চঞ্চু বা ঠোঁটে রূপান্তরিত।
আর্কিওপটেরিক্সের এই জীবাশ্ম প্রমাণ করে যে, সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী (যেমন- ডাইনোসর) থেকেই বিবর্তনের মাধ্যমে পাখির উৎপত্তি হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন শিলাস্তরে ডাইনোসরের কঙ্কাল, ডিম এবং পদচিহ্নের জীবাশ্ম পাওয়ার মাধ্যমে এটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় যে, অতীতে পৃথিবীতে ডাইনোসরের অস্তিত্ব ছিল। সুতরাং, ডাইনোসরের অস্তিত্ব প্রমাণে জীবাশ্মঘটিত প্রমাণই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত।