(ক)
প্রথা হলো প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা আচার-ব্যবহার, রীতিনীতি ও অভ্যাসের সমষ্টি, যা সমাজের অধিকাংশ মানুষ কর্তৃক সমর্থিত, স্বীকৃত ও পালিত হয়ে আসছে।
(খ)
মানবাধিকার বলতে সেই সকল মৌলিক অধিকারকে বোঝায় যা বিশ্বের প্রতিটি মানুষ জন্মগতভাবে লাভ করে এবং যা জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, জাতীয়তা নির্বিশেষে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। মূলত মানবাধিকার অধিকারেরই একটি বিস্তৃত রূপ, যা কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা কালের সীমানায় আবদ্ধ নয় বরং সর্বজনীন এবং সব দেশের সব কালের মানুষের জন্য প্রযোজ্য।
(গ)
উদ্দীপকে বর্ণিত ঘটনার প্রেক্ষিতে আমি মনে করি, নারী শ্রমিকরা অর্থনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
যেসব অধিকার ব্যক্তিকে অভাব ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিয়ে অর্থনৈতিক জীবনের নিরাপত্তা বিধান করে, তাকেই সাধারণত অর্থনৈতিক অধিকার বলা হয়। ন্যায্য মজুরি লাভের অধিকার অর্থনৈতিক অধিকারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রূপ। এটি একটি স্বীকৃত অধিকার, যা জাতি, বর্ণ, প্রথা, ধর্ম ও লিঙ্গের ঊর্ধ্বে কেবল কাজের বিনিময়ে যথাযথ পারিশ্রমিক পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয়।
উদ্দীপকের রাশিদা একজন পোশাক কর্মী। মালিকপক্ষ তার প্রতিষ্ঠানে সকল পুরুষ শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি করলেও রাশিদাসহ নারী শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি করেনি। যদিও নারী ও পুরুষ শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্র অভিন্ন এবং কাজের ধরন ও ঘণ্টা সমান, তথাপি লিঙ্গভেদে মজুরির ক্ষেত্রে বৈষম্য করা হয়েছে। এর ফলে রাশিদা ও তার সহকর্মীদের ন্যায্য মজুরি লাভের অধিকার খর্ব হয়েছে, যা তাদের অর্থনৈতিক অধিকারের পরিপন্থী।
সুতরাং, বলা যায় যে উদ্দীপকের নারী শ্রমিকরা অর্থনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
(ঘ)
রাশিদার প্রতি মালিকপক্ষের এই বৈষম্যমূলক আচরণ সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এর সপক্ষে যুক্তিগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
প্রথমত, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুবিচার পাওয়ার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। যখন এই অধিকার খর্ব করা হয়, তখন শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ জন্মায়, যা সমাজে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
দ্বিতীয়ত, অধিকারের স্বীকৃতি ও সংরক্ষণ নাগরিকের আত্মবিকাশে সাহায্য করে। রাশিদার মতো নারী শ্রমিকরা যখন তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে, তখন তাদের আত্মবিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের পূর্ণ সুবিধা প্রাপ্তি এবং নাগরিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হবে।
তৃতীয়ত, ব্যক্তিত্ব ও নৈতিক গুণাবলির বিকাশ অধিকার ভোগ ও কর্তব্য পালনের ওপর নির্ভর করে। বৈষম্যমূলক আচরণের ফলে রাশিদা ও তার সহকর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হবে, যা তাদের কর্মস্পৃহা কমিয়ে দেবে। এর ফলে সামগ্রিক উৎপাদন হ্রাস পাবে এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হবে, যা রাষ্ট্রকে পিছিয়ে দেবে।
চতুর্থত, ন্যায্য মজুরির অধিকারের আইনগত ভিত্তি রয়েছে। মালিকপক্ষের এই আচরণ আইনের পরিপন্থী, যা সমাজে আইনের শাসনের প্রতি অনাস্থা তৈরি করবে এবং সাম্য বিধানের পথে অন্তরায় হবে।
পরিশেষে বলা যায়, লিঙ্গভেদে মজুরির এই বৈষম্য কেবল ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।