(ক) তথ্য অধিকার হলো রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত এমন একটি আইনগত অধিকার, যার মাধ্যমে একজন নাগরিক সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত কোনো কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সুযোগ লাভ করে।
(খ) "সকল মৌলিক অধিকারই মানবাধিকার, কিন্তু সকল মানবাধিকার মৌলিক অধিকার নয়"- উক্তিটি সঠিক। মানবাধিকার হলো মানুষের জন্মগত ও সর্বজনীন অধিকার, যা পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য এবং যার উৎস আন্তর্জাতিক চেতনা ও জাতিসংঘ। যখন কোনো রাষ্ট্র এই মানবাধিকারগুলোকে তার সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে এবং আইনি সুরক্ষা প্রদান করে, তখন তা মৌলিক অধিকারে পরিণত হয়। তবে সব মানবাধিকার সংবিধানে স্থান পায় না, তাই সব মানবাধিকার মৌলিক অধিকার নয়। কিন্তু মৌলিক অধিকারগুলো যেহেতু মানুষের মৌলিক চাহিদার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, তাই সব মৌলিক অধিকারই মূলত মানবাধিকার।
(গ) উদ্দীপকে মানবাধিকারের কথা বলা হয়েছে।
মানুষ পৃথিবীতে জন্মগতভাবে যে সকল সুযোগ-সুবিধার দাবিদার হয় এবং যা ছাড়া মানুষের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে না, সে সকল সুযোগ-সুবিধা হচ্ছে মানবাধিকার। মানবাধিকার হলো অধিকারেরই একটি বিস্তৃত রূপ, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আইনগত ও নৈতিক অধিকারগুলোর মধ্যে সেসব অধিকারকে মানবাধিকার বলা হয় যা পৃথিবীর সকল মানুষ শুধু মানুষ হিসেবে দাবি করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে মানব পরিবারের সকল সদস্যের জন্য সহজাত, সর্বজনীন ও হস্তান্তরযোগ্য কিছু অধিকারই হলো মানবাধিকার।
উদ্দীপকে দেখা যায়, রহিম মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চল হতে নিপীড়িত ও অত্যাচারিত হয়ে কক্সবাজার শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করেছে এবং সেখানে জাতিসংঘ ঘোষিত সকল নাগরিকের সমানাধিকার ও মানবিক মর্যাদা লঙ্ঘিত হয়েছে। এই বর্ণনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, এখানে জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকারের কথা বলা হয়েছে। কারণ জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, বিশ্বে স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও শান্তির ভিত্তি হচ্ছে সব মানুষের সহজাত মর্যাদা ও সব অবিচ্ছেদ্য অধিকারের স্বীকৃতি। এর মাধ্যমে সকল মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের সার্বজনীন স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকে মানবাধিকারের কথা বলা হয়েছে।
(ঘ) সুশাসন প্রতিষ্ঠায় উক্ত অধিকারসমূহের তথা মানবাধিকারের তাৎপর্য অপরিসীম।
সুশাসন হলো এমন এক শাসন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সুষ্ঠুভাবে চর্চা করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় জনগণ স্বাধীনভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে, সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত থাকে এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ করতে পারে। সুশাসন মূলত স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করে এবং আর্থসামাজিক অগ্রগতিকে প্রাধান্য দেয়।
একটি রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো মানুষের অধিকারের অভাব। যদি কোনো রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো কর্তৃত্বমূলক হয়, তবে সেখানে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক রীতিনীতি যেমন সর্বজনীন ভোটাধিকার, বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সভা-সমিতির অধিকার কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয় না। শাসকগোষ্ঠী গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হলেও ক্ষমতার চর্চা করে স্বেচ্ছাচারিতার সাথে, ফলে জনগণের মানবাধিকার নিশ্চিত হয় না।
তাই একটি সমাজে বা রাষ্ট্রে যদি মানবাধিকারসমূহ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গৃহীত হয়, তবে সুশাসনের প্রতিবন্ধকতাসমূহ দূর হবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হবে। মানবাধিকার নিশ্চিত হলে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়, দুর্নীতি নির্মূলে সহায়তা হয়, দারিদ্র্য বিমোচন ত্বরান্বিত হয় এবং গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকরণ নিশ্চিত হয়। এর ফলে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়, যা সুশাসনের মূল ভিত্তি।
পরিশেষে বলা যায়, একটি রাষ্ট্রে মানুষ হিসেবে মানুষের সকল অধিকার তথা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা লাভ করলে প্রতিটি মানুষ সচেতন হবে এবং রাষ্ট্রের সামগ্রিক শাসন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আসবে। তাই সুশাসন প্রতিষ্ঠায় মানবাধিকার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।