ক.
মুসা বিন নুসাইর ৬৪০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন।
খ.
প্রথম আবদুর রহমানের উত্তরাধিকারীদের দ্বারা সুসমৃদ্ধ কর্ডোভা ছিল সমসাময়িক যুগের জগৎমণি, অনুপম ও ঐশ্বর্যশালী এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নগরী। মূর সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র কর্ডোভার গৌরব ও বৈভব ছিল অতুলনীয়। এ নগরী ছিল সৌন্দর্যমন্ডিত ও সুরক্ষিত। উমাইয়া শাসনকালে কর্ডোভার দৈর্ঘ্য ২৪ মাইল, প্রশ্ন ৬ মাইল এবং ১৪ মাইল। পরিধিবিশিষ্ট ছিল। লোকসংখ্যা ছিল ১০ লক্ষ। এসময় কর্ডোভায় ৩০০ মসজিদ, ১০০ প্রাসাদ, ১৩,০০০ তাঁত শিল্প এবং ৩৮০টি হাম্মামখানা গড়ে উঠেছিল। অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, জমকালো আল-জোহরা প্রাসাদ, সমর প্রস্রবণ, পুষ্পোদ্যান ইত্যাদি কর্ডোভাকে এক অপরূপা নগরীতে পরিণত করেছিল। যার ফলে কর্ডোভা নগরীকে ইউরোপের বাতিঘর বলা হয়।
গ.
উদ্দীপকের রহিমের যাবতীয় কর্মকান্ড বৈদেশিক বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। তাকে পররাষ্ট্রনীতি মেনে চলতে হয়। তার কার্যক্রমের সাথে তৃতীয় আবদুর রহমানের বৈদেশিক নীতির যথেষ্ট মিল রয়েছে।
তৃতীয় আব্দুর রহমানের বৈদেশিক নীতির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল স্পেনের খ্রিস্টানদের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে ধ্বংস করা। তার মনে সর্বদাই ভীতি সঞ্চারিত ছিল যে খ্রিষ্টানদের শক্তি তার রাজ্যে ধ্বংস ডেকে আনবে। তাই তিনি খ্রিষ্টানদের সকল আন্দোলন কঠোর হস্তে দমন করেন। তার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক নীতি হলো ভূমধ্যসাগরে ফাতেমি নৌবহরের প্রভাব খর্ব করা। তিনি রাজ্যের শান্তিশৃঙ্খলা ধ্বংসকারী যেকোনো অপশক্তিকে সমুচিত শিক্ষা দিতে কুণ্ঠিত হতেন না। তবে তিনি তার স্বীয় সাম্রাজ্যে শান্তি ও সমৃদ্ধি আনয়নের লক্ষ্যে সকল রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেন। তিনি ঐসব দেশের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতেন যেসব দেশ কোনোদিন তার দেশের স্বার্থে আঘাত করবে না। তবে স্বীয় রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য তিনি অপর রাষ্ট্রকে আঘাত করতেও কুণ্ঠিত হতেন না। তাছাড়া তার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপীয় রাজন্যবর্গের সাথে মিত্রতা বজায় রাখা। তাই এতদুদ্দেশ্যে তিনি পার্শ্ববর্তী দেশের সাথে দূত বিনিময় করেন। তিনি শত্রুভাবাপন্ন নাভারি ও লিওঁবাসীদের আক্রমণ করে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন। তার বৈদেশিক নীতিতে কূটনৈতিক দূরদর্শিতা প্রতিফলিত হয়েছে।
তিনি বহির্বিশ্বের সাথে মৈত্রীবন্ধন স্থাপনের লক্ষ্যে শক্তির ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করেন। তার মৈত্রীবন্ধন আহ্বানে সাড়া দিয়ে কনস্টান্টিনোপলের সম্রাট, জার্মান নৃপতি এবং ফ্রান্স ও ইতালির রাজাগণ তার দরবারে দূত প্রেরণ করেন।
ঘ.
বৈদেশিক অতিথিদের জন্য ব্যবহৃত প্রাসাদটির সাথে আলজোহরা প্রাসাদের যথেষ্ট মিল রয়েছে।
বহু প্রশংসিত আল-জোহরা প্রাসাদ ৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে সিয়েরার মারনার নাব্য অঞ্চলে কডোর্ভার তিন মাইল পশ্চিমে জাবানুল উত্তুসে নির্মিত হয়। খলিফা তৃতীয় আবদুর রহমান তার প্রিয়তম উপপত্নী সুন্দরী শ্রেষ্ঠা আল-জোহরার স্মরণে প্রাসাদটি নির্মাণ করেন এবং তার নামানুসারে নাম দেন 'আল-জোহরা প্রাসাদ'। এর প্রধান অংশ নির্মাণে সময় লাগে পনের বছর। অবশিষ্ট অংশের নির্মাণ কাজ সমাধান করতে আরও পঁচিশ বছর সময় লাগে। অর্থাৎ তৃতীয় আবদুর রহমান কর্তৃক এর নির্মাণ কাজ শুরু হয় ৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে এবং ৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় আল-হাকামের শাসনামলে সমাপ্ত হয়। আল-জোহরা। প্রাসাদ ২৮০ একর জুড়ে বিস্তৃত এক স্থানে গড়ে ওঠে। এর নির্মাণ কাজে ১০,০০০ শ্রমিক, ১,৮০০ ভারবাহী জানোয়ার প্রতিদিন ব্যবহৃত হতো। এটি নির্মাণে খলিফা তৃতীয় আবদুর রহমান ৫০,০০,০০০। দিনার ব্যয় করেন। গড়ে প্রতিবছর এর নির্মাণ কাজে ১,২০,০০০ দিনার ব্যয় হতো।
পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান হতে সংগৃহীত সাদা, মণি রং, গোলাপি, সবুজ প্রভৃতি বিভিন্ন বর্গের মার্বেল দ্বারা এটি প্রস্তুত করা হয়। আল-জোহরা প্রাসাদ তিনটি নিম্নগামী ছাদ দ্বারা বিভক্ত ছিল। উপরের ছাদে একটি হেরেমখানা, একটি অন্দর মহল এবং একটি দুর্গ ছিল। এছাড়াও আল-হামরা জামে মসজিদ ও অভ্যর্থনা কক্ষ এ ছাদে অবস্থিত ছিল। দাসদাসীদের বসবাসের জন্য নিম্ন ছাদে গৃহ ছিল। মধ্য ছাদে বাগান, ছায়াঘেরা কুঞ্জবন ও জলকেলির জলাশয় ছিল। এ প্রাসাদের প্রবেশ পথ ছিল ৭৫০টি এবং খাম্বা ছিল ৪,৩১৬টি। এর ভেতরের ছোট স্নানাগারটি বহু মূল্যবান রত্ন ও মণিমুক্তাখচিত বারটি স্বর্ণমূর্তি পরিবেষ্টিত ছিল। এর উপরে চিত্রিত ছিল সিংহ, হরিণ, কুমির, ঈগল, ড্রাগন, ঘুঘু, বাজপাখি, মুরগি প্রভৃতির মূর্তি যাদের মুখ হতে অনবরত পানি নির্গত হতো।
উপরিউক্ত আলোচনায় বলা যায়, ইতিহাসে আল-জোহরা প্রাসাদ একটি ব্যয়বহুল প্রাসাদ নামে খ্যাতি অর্জন করলেও এটি তৎকালীন আমলের শিল্প নিদর্শনের এক অমর কীর্তি।