ক.
সংস্কৃতির রূপ দুইটি। যথা- বস্তুগত ও অবস্তুগত।
খ.
বিশিষ্ট আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী উইলিয়াম এফ অগবার্ন তার 'Social Change' গ্রন্থে সংস্কৃতির পশ্চাৎপদতা সম্পর্কিত যে তত্ত্ব সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রদান করেন তাই মূলত 'সাংস্কৃতিক ব্যবধান তত্ত্ব' হিসেবে পরিচিত।
সাংস্কৃতিক ব্যবধান বলতে সাধারণত সংস্কৃতির দুটি অংশের মধ্যে বিদ্যমান পার্থক্যকে বোঝায়। অর্থাৎ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যাপক অগ্রগতির ফলে বস্তুগত সংস্কৃতি (Material Culture) দ্রুতগতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে, যার সাথে অবস্তুগত সংস্কৃতি (Non-material Culture) খাপ খাইয়ে বা তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদতা বা পিছিয়ে পড়া। সংক্ষেপে এটাই হলো সাংস্কৃতিক ব্যবধান।
গ.
উদ্দীপকে উল্লেখিত 'বই' উদাহরণটি দিয়ে সংস্কৃতির উভয় প্রকরণ অর্থাৎ বস্তুগত ও অবস্তুগত সংস্কৃতিকে স্পষ্টভাবে বোঝানো সম্ভব।
সংস্কৃতির যে অংশ দৃশ্যমান এবং স্পর্শ করা যায় তাকে বস্তুগত সংস্কৃতি বলে এবং যে অংশ অদৃশ্য বা উপলব্ধির ওপর নির্ভরশীল তাকে অবস্তুগত সংস্কৃতি বলে। যেমন- ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র ইত্যাদি হলো বস্তুগত সংস্কৃতি এবং জ্ঞান, প্রজ্ঞা বা মূল্যবোধ প্রভৃতি হলো অবস্তুগত সংস্কৃতি। সংস্কৃতির এই দুই রূপ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।
উদ্দীপকে শিক্ষক 'বই'-এর উদাহরণ দিয়েছেন। একটি বইয়ের কাগজ, কালি, বাঁধাই এবং এর বাহ্যিক অবয়ব হলো বস্তুগত সংস্কৃতি, কারণ এটি দৃশ্যমান ও স্পর্শযোগ্য। অন্যদিকে, বইয়ের ভেতরে থাকা জ্ঞান, তথ্য, চিন্তা বা দর্শন হলো অবস্তুগত সংস্কৃতি, যা কেবল পাঠের মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায়। সুতরাং একটি বইয়ের মাধ্যমে বস্তুগত (বাহ্যিক রূপ) ও অবস্তুগত (অভ্যন্তরীণ জ্ঞান) উভয় সংস্কৃতির ধারণা পাওয়া যায়। তাই বলা যায়, শিক্ষকের দেওয়া এই একক উদাহরণটি সংস্কৃতির প্রকরণ বা প্রকারভেদ বোঝাতে অত্যন্ত কার্যকর ও যথার্থ।
ঘ.
উদ্দীপকে শিক্ষক সংস্কৃতির সাথে সভ্যতার যে সম্পর্কের কথা বলেছেন তা অত্যন্ত যৌক্তিক এবং সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক।
সভ্যতা বলতে মানব সংস্কৃতির এমন একটি উন্নত ও জটিল পর্যায়কে বোঝায়, যা নগর জীবনের বিকাশের সাথে সম্পর্কিত। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকাইভারের মতে, "আমরা যা করি তাই আমাদের সংস্কৃতি এবং আমাদের যা কিছু আছে তাই সভ্যতা।” অর্থাৎ সংস্কৃতি হলো মানুষের জীবনপ্রণালী এবং সভ্যতা হলো সেই প্রণালীর দৃশ্যমান ও প্রতিষ্ঠিত রূপ।
উদ্দীপকের শিক্ষক সংস্কৃতির সাথে সভ্যতার গভীর সম্পর্কের কথা বলেছেন। বস্তুত সংস্কৃতি ও সভ্যতা একে অপরের পরিপূরক; সংস্কৃতি যদি হয় মানুষের অভ্যন্তরীণ গুণাবলি বা চিন্তা, তবে সভ্যতা হলো তার বাহ্যিক ও বস্তুগত প্রকাশ। যেমন- ঘরবাড়ি তৈরির জ্ঞান হলো সংস্কৃতি এবং নির্মিত অট্টালিকা বা শহর হলো সভ্যতা। কার্যত সংস্কৃতির বস্তুগত উপাদানের চরম বিকাশই মূলত সভ্যতার জন্ম দেয়।
সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংস্কৃতি ও সভ্যতা অবিচ্ছেদ্য। সংস্কৃতিকে সভ্যতার আত্মা বলা হয়, কারণ সংস্কৃতির পরিবর্তন ও বিকাশের মাধ্যমেই সভ্যতার রূপান্তর ঘটে। সভ্যতার প্রতিটি উপাদানের মূলে থাকে মানুষের সাংস্কৃতিক চিন্তা ও দক্ষতা। সুতরাং, সভ্যতাকে সংস্কৃতির একটি বিশেষ বা চূড়ান্ত রূপ হিসেবে অভিহিত করা সম্পূর্ণ যথার্থ। সংস্কৃতি ছাড়া সভ্যতার কোনো অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না, কারণ মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতি বা সংস্কৃতিই সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। এ আলোচনায় স্পষ্ট, উদ্দীপকের শিক্ষক সংস্কৃতি ও সভ্যতার যে সম্পর্কের কথা বলেছেন তা সঠিক।