ক.
ব্রিটিশ ভারতের সর্বশেষ গভর্নর জেনারেল ছিলেন লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন।
খ.
ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার শাসনভার সংক্রান্ত দায়িত্ব দুটি পৃথক সংস্থার হাতে ন্যস্ত করাই হলো দ্বৈত শাসন।
১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে দেওয়ানি (রাজস্ব) আদায়ের ক্ষমতা লাভের পর লর্ড ক্লাইভ বাংলায় দ্বৈতশাসন প্রবর্তন করেন। দ্বৈত শাসনের অর্থ হলো দু'জনের শাসনব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, ফৌজদারি বিচার, শান্তিরক্ষা, দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় বাংলার নবাবের হাতে। অন্যদিকে, বাংলার রাজস্ব আদায়, দেওয়ানি সংক্রান্ত বিচার, জমির বিবাদ সম্পর্কিত বিচার কোম্পানির ওপর ন্যস্ত হয়। অর্থাৎ এ ব্যবস্থায় কোম্পানি লাভ করে দায়িত্বহীন ক্ষমতা। অন্যদিকে নবাব পান ক্ষমতাহীন দায়িত্ব।
গ.
উদ্দীপকে বর্ণিত শাসন ব্যবস্থা হলো যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা। ব্রিটিশ ভারতের ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে এ ধরনের শাসনব্যবস্থার উল্লেখ আছে।
ভারতের সাংবিধানিক বিবর্তনের ইতিহাসে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। ভারতীয় জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবোধের উন্মেষ, রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ এবং ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনের ব্যর্থতার ফলশ্রুতিই হলো ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন। এই আইনেই উদ্দীপকে ইঙ্গতকৃত যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।
উদ্দীপকে রফিকের দেশে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমকে কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। প্রাদেশিক সরকার সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তার কাজ করতে পারবে। এখানে রাষ্ট্রীয় সকল ক্ষেত্রে সংবিধানের প্রাধান্য বিদ্যমান। এছাড়া দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার উচ্চকক্ষ প্রদেশসমূহের প্রতিনিধিত্ব করছে। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে প্রস্তাবিত যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এ বিষয়গুলো লক্ষ করা যায়, কেন্দ্রীয় বিষয়গুলো কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে এবং প্রাদেশিক বিষয়গুলো প্রাদেশিক সরকারের হাতে ন্যস্ত করা হয়। এ আইনের বলে প্রদেশগুলোতে স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা হয়। এর ফলে প্রদেশগুলো সুনিদিষ্ট ক্ষমতা লাভ করে এবং প্রাদেশিক সরকার দায়িত্বশীল হয়। এছাড়া প্রাদেশিক সরকারের ওপর ন্যস্ত বিষয়গুলোকে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপমুক্ত করা হয়। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে কেন্দ্রে উচ্চ পরিষদ ও নিম্নপরিষদ নামে দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার প্রবর্তন করা হয়। এ আইনসভায় উচ্চ পরিষদ কর্তৃক প্রদেশসমূহের প্রতিনিধিত্ব করার কথা বলা হয়। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন একটি জটিল আইনে। তবে রাষ্ট্রীয় সকল ক্ষেত্রে এই আইনে অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার প্রাধান্যের কথা বলা হয়েছে। এ আলোচনা থেকে বোঝা যায়, উদ্দীপকে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে প্রবর্তিত যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার ইঙ্গিত বিদ্যমান।
ঘ.
উদ্দীপকে ইঙ্গিতকৃত আইন অর্থাৎ ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন বিভিন্ন কারণে অকার্যকর হয়ে পড়েছিল।
ব্রিটিশ ভারতের শাসনতান্ত্রিক অগ্রগতি ও বিবর্তনের ক্ষেত্রে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার। এ আইন প্রকৃতপক্ষে ১৯৩৭ সাল থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট অর্থাৎ ভারতবর্ষ বিভক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কার্যকর ছিল। তবুও এ আইন বিভিন্ন মহলে বহুলভাবে সমালোচিত হয়।
১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা হলেও বিভিন্ন কারণে তা যথার্থ ছিল না। তাই স্বায়ত্তশাসনের কার্যকারিতার পথে ওই কারণগুলো বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে গভর্নরগণ ছিলেন প্রকৃত শাসক। তারা ব্রিটিশ রাজা বা রানি কর্তৃক নিযুক্ত হতেন এবং সীমাহীন ক্ষমতা লাভ করতেন। তাদের এই ক্ষমতা এবং তার অপব্যবহার প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের মৌলিক ধারণার সাথে অসংগতিপূর্ণ ছিল। গভর্নর জেনারেলেরও ছিল অপ্রতিহত ক্ষমতা। এই ক্ষমতা স্বায়ত্তশাসনের মৌলিক নীতিকে খর্ব করেছিল। এছাড়া প্রাদেশিক আইনসভার সীমাবদ্ধতা, যুগ্ম তালিকার ক্ষেত্রে কেন্দ্রের প্রাধান্য, আমলা, বিভাগীয় কর্মকর্তাদের দৌরাত্ম্য, গভর্নরের নিয়ন্ত্রনাধীন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভাগ, প্রাদেশিক বিষয়ে বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি বিষয় প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। ফলে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে যে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পরিকল্পনা করা হয়েছিল তা কোনো দিনই কার্যকর হয়নি।
পরিশেষে বলা যায়, ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের দ্বারা ব্রিটিশ ভারতের প্রাদেশিক প্রশাসনে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করা হলেও এটি কোনো প্রকৃত এবং পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা ছিল না। মূলত এ শাসন ব্যবস্থা ছিল একটা আড়ম্বরপূর্ণ প্রহসনমাত্র। ফলে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন তার মৌলিকতা হারিয়ে এক বিকৃত ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল।