ক.
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটেছিল ১৯৯১ সালে।
খ.
'গ্লাসনস্ত' একটি রুশ শব্দ, যার অর্থ হলো 'খোলামেলা অবস্থা' বা 'উন্মুক্ততা'। এটি সোভিয়েত ইউনিয়নের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ কর্তৃক প্রবর্তিত একটি যুগান্তকারী রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কার নীতি।
১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে গর্বাচেভ এই নীতি গ্রহণ করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত সরকার ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বৃদ্ধি করা এবং নাগরিকদের মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিনের কমিউনিস্ট কড়াকড়ি শিথিল করে রাষ্ট্রের সকল স্তরে জনগণের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর জন্যই মূলত গ্লাসনস্ত নীতি প্রবর্তন করা হয়েছিল।
গ.
উদ্দীপকের ঘটনাটি পাঠ্যপুস্তকের জার্মানির বিভক্তি এবং পরবর্তীতে বার্লিন প্রাচীর পতনের মাধ্যমে দুই জার্মানির একত্রীকরণ-এর ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে সম্পূর্ণ সাদৃশ্যপূর্ণ।
উদ্দীপকে দেখা যায়, রনি ও জনি দুই ভাই আদর্শিক দ্বন্দ্বের কারণে বাড়ির মাঝখানে দেওয়াল তুলে আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু বহু বছর পর তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে দেওয়াল ভেঙে পুনরায় একসাথে বসবাস শুরু করে।
পাঠ্যবইয়ের ইতিহাসেও আমরা একই ঘটনার প্রতিফলন দেখতে পাই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আদর্শিক দ্বন্দ্ব বা স্নায়ুযুদ্ধের জেরে জার্মানি দুটি রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে— পুঁজিবাদী আদর্শের পশ্চিম জার্মানি এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শের পূর্ব জার্মানি। ১৯৬১ সালে দুই জার্মানির মাঝখানে বার্লিন শহরে বিখ্যাত 'বার্লিন প্রাচীর' নির্মাণ করে তাদের সম্পূর্ণ আলাদা করে দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ ২৮ বছর পর, ১৯৮৯ সালে জার্মান জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেই বার্লিন প্রাচীর ভেঙে ফেলে এবং পরবর্তীতে ১৯৯০ সালের ৩ অক্টোবর পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি পুনরায় একত্রিত হয়ে একটি অখণ্ড রাষ্ট্রে পরিণত হয়। উদ্দীপকের দুই ভাইয়ের মাঝে দেওয়াল তোলা এবং পরবর্তীতে তা ভেঙে ফেলার বিষয়টি মূলত জার্মানির এই ঐতিহাসিক বিভক্তি ও একত্রীকরণকেই নির্দেশ করে।
ঘ.
উক্ত ঘটনা অর্থাৎ বার্লিন প্রাচীরের পতন ও দুই জার্মানির একত্রীকরণ-এর ঘটনাটি সমকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল। পাঠ্যপুস্তকের আলোকে এর প্রভাব নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ত্বরান্বিতকরণ: বার্লিন প্রাচীরের পতন এবং জার্মানির একত্রীকরণ ছিল স্নায়ুযুদ্ধ বা কোল্ড ওয়ারের অবসানের সবচেয়ে বড় প্রতীক। বিশ্বে সমাজতান্ত্রিক ব্লকের পতন যে শুরু হয়ে গেছে, এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি বিশ্ববাসীকে সেই বার্তাই স্পষ্টভাবে দিয়ে দেয়।
২. জার্মানির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির উত্থান: বিভক্ত জার্মানি একত্র হওয়ার ফলে ইউরোপের বুকে জার্মানি পুনরায় একটি শক্তিশালী ও অখণ্ড রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পশ্চিম জার্মানির শক্তিশালী অর্থনীতি এবং পূর্ব জার্মানির বিশাল জনশক্তি মিলে জার্মানিকে ইউরোপের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত করে।
৩. ইউরোপীয় ইউনিয়নের শক্তিশালীকরণ: জার্মানির একত্রীকরণ সমগ্র ইউরোপের ঐক্যের পথ সুগম করেছিল। একটি ঐক্যবদ্ধ ও গণতান্ত্রিক জার্মানি পরবর্তীতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠন, এর সম্প্রসারণ এবং ইউরোপের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৪. সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সূচনা: জার্মানির একত্রীকরণের ফলে পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের যে পতন শুরু হয়, তার ঢেউ খোদ সোভিয়েত ইউনিয়ন পর্যন্ত পৌঁছায়। এর ধারাবাহিকতায় পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোতেও একে একে সমাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৯১ সালে খোদ সোভিয়েত ইউনিয়নই ভেঙে যায়।
পরিশেষে বলা যায়, উদ্দীপকে উল্লেখিত দেওয়াল ভাঙার মতো দুই জার্মানির একত্রীকরণের ঘটনাটি কেবল জার্মান জাতির জন্যই আনন্দদায়ক ছিল না, বরং এটি বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ এবং আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসকে নতুন করে লেখার পথ তৈরি করে দিয়েছিল।