ক.
কযে খামারে পারিবারিক শ্রম ব্যবহার করে পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদন করা হয় তাকে জীবননির্বাহী খামার বলে।
খ.
বাংলাদেশের কৃষি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। এখানে বৃষ্টিপাত নিয়মিত, পর্যাপ্ত ও সময়মতো হলে কৃষিকাজ সফলতার সাথে পরিচালনা করা যায়; অন্যথায় কৃষি উৎপাদন দারুণভাবে ব্যাহত হয়। তাছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটায় সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, নদীতে লোনা পানির প্রবেশ ইত্যাদি সমস্যাও দেখা দিচ্ছে, যা কৃষি উৎপাদন বাধাগ্রস্ত করে তুলছে। সুতরাং বলা যায়, বাংলাদেশে প্রকৃতিনির্ভর কৃষি উন্নয়নের একটি বড় সমস্যা।
গ.
রাজারামপুর গ্রামের বর্গাচাষি আনু মিঞা অন্যের ৫ বিঘা জমি চাষ করেন। তিনি একজন দরিদ্র কৃষক হওয়ায় প্রয়োজনীয় কৃষি- উপকরণসমূহ ক্রয় এবং কৃষিকাজ সুষ্ঠুরূপে পরিচালনার জন্য ঋণ গ্রহণ করতে বাধ্য হন। ইতিপূর্বে স্বল্প সুদের হারে প্রয়োজনমাফিক ঋণ প্রাপ্তির জন্য তিনি স্থানীয় বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের শাখায় যান। কিন্তু সেখানে ব্যাংক ঋণ প্রদান পদ্ধতি জটিল, সময়ক্ষেপণকারী ও হয়রানিমূলক হওয়ায় তিনি বাধ্য হয়েই কৃষিকাজের ব্যয় নির্বাহের জন্য আবাদ মৌসুমে গ্রাম্য মহাজনের শরণাপন্ন হন। তার কাছ থেকে অত্যন্ত কঠিন শর্তে ও চড়া সুদে ঋণ গ্রহণ করেন।
আনু মিঞা যে উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ করেছেন তা কৃষি ঋণের অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎস বলে পরিচিত। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, গ্রাম্য মহাজন, গ্রাম্য ব্যবসায়ী ও দোকানদার, ধনী কৃষক, দালাল, ব্যাপারি ও প্রতিবেশীরা হলো অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণের বিভিন্ন উৎস। ঋণের এ উৎসগুলো প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ-উৎসগুলোর মতো নিয়মতান্ত্রিক এবং সরকারি বিধি-বিধানের অধীন নয়। এগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন- কানুন ও শর্তের বাইরে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিজস্ব নিয়মানুযায়ী। পরিচালিত হয়। ঋণের এসব উৎস এককথায় অসংগঠিত, অনিশ্চিত এবং শোষণমূলক আনু মিঞাদের মতো কৃষক এরকম উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ করে প্রায়ই প্রতারিত হন; এমনকি কখনো কখনো নিঃস্ব হয়ে পড়েন।
ঘ.
বাংলাদেশে আনু মিঞাদের মতো দরিদ্র কৃষকদের কৃষিঋণ সমস্যা লাঘবের জন্য বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সরকারের গৃহীত ঋণ-কর্মসূচি নিচে মূল্যায়ন করা হলো:
১. ঋণের অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎসগুলো ঋণগ্রহণকারী কৃষকদেরকে যাতে অযথা হয়রানি কিংবা শোষণ করতে না পারে সে জন্য সরকার একটি জাতীয় ঋণ সালিশ বোর্ড গঠন করেছে। এ বোর্ড ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে আপস-মীমাংসা করে।
২. কৃষি উৎপাদন বিনিয়োগের স্বল্পতা দূর করার জন্য সরকার বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে। এগুলোর মাধ্যমে মাঝারি সুদের হারে কৃষকদেরকে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রদান করা হয়। এ ছাড়া নগদ তহবিল সরবরাহের মাধ্যমে সরকার ৪টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিআরডিবি, বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক লি. এবং বেসরকারি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে কৃষি ঋণদান কার্যক্রমে সাথে জড়িত করছে।
৩. সরকার কৃষিঋণ বিতরণ সহজতর করার লক্ষ্যে বর্ধিত কলেবরে কৃষি/পল্লী ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি প্রণয়ন করেছে। ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়া সহজতর করার জন্য নীতিমালায় নতুন নতুন বিষয় সন্নিবেশিত হচ্ছে।
৪. সকল ব্যাংকের কার্যকর অংশগ্রহণের মাধ্যমে কৃষিঋণের পরিবেশ ও আওতা বাড়ানো এবং পল্লী এলাকায় ব্যাংকিং কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণের কৌশলগত পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে।
৫. প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের কথা চিন্তা করে সরকার ক্ষুদ্র কৃষক উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের আওতায় জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি চালু করেছে।
৬. আমদানি বিকল্প শস্য চাষে শতকরা ৪ ভাগ রেয়াতি সুদের হারে ঋণ প্রদান করা হচ্ছে।
৭. ২০১৩ সালের জুন মাস পর্যন্ত ১০ টাকার বিনিময়ে ৯৬.৩২ লক্ষ কৃষকের ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। এ হিসাবের মাধ্যমে কৃষকদেরকে ঋণ বিতরণ, সঞ্চয় এবং রেমিট্যাস সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। কৃষকরা সঞ্চয়মুখী হলে সামগ্রিকভাবে কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়বে।
সুতরাং বলা যায়, আনু মিঞাদের মতো কৃষকদের সমস্যা লাঘবের জন্য সরকার কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচি আপাতত যথেষ্ট বলেই মনে হয়।