ক.
যে অবরোহ অনুমানে অন্য কোনো বাক্যের সাহায্য ছাড়া কেবল একটিমাত্র আশ্রয়বাক্য থেকে সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, তাকে অমাধ্যম অনুমান বলে।
খ.
অবরোহ অনুমান হলো এমন এক ধরনের অনুমান, যেখানে সিদ্ধান্তটি প্রদত্ত এক বা একাধিক আশ্রয়বাক্য থেকে অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয়। এর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এর সিদ্ধান্ত কখনোই আশ্রয়বাক্যের চেয়ে বেশি ব্যাপক হতে পারে না।
অবরোহ অনুমানে আমরা সবসময় সার্বিক বা ব্যাপক ধারণা থেকে বিশেষ বা কম ব্যাপক ধারণার দিকে অগ্রসর হই। যেহেতু সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণভাবে পূর্বপ্রদত্ত আশ্রয়বাক্যগুলোর ভেতরেই নিহিত থাকে, তাই সিদ্ধান্তটি আশ্রয়বাক্যের সমব্যাপক হতে পারে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই আশ্রয়বাক্যকে অতিক্রম করে বেশি ব্যাপক হতে পারে না। এ কারণেই বলা হয়, অবরোহ অনুমানের সিদ্ধান্ত সাধারণত আশ্রয়বাক্য থেকে কম ব্যাপক হয়ে থাকে।
গ.
উদ্দীপকের যুক্তি-১ 'আরোহ অনুমান' -কে নির্দেশ করে।
যে অনুমানে কয়েকটি বিশেষ বস্তু বা ঘটনার দৃষ্টান্ত পর্যবেক্ষণ করে তার ওপর ভিত্তি করে একটি সার্বিক সিদ্ধান্ত স্থাপন করা হয়, তাকে আরোহ অনুমান বলে। আরোহ অনুমানের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এখানে জানা থেকে অজানা এবং বিশেষ বা কম ব্যাপক ধারণা থেকে সার্বিক বা বেশি ব্যাপক ধারণায় গমন করা হয়।
উদ্দীপকের যুক্তি-১ এ বলা হয়েছে, "গোলাপ হয় সুন্দর, সূর্যমুখী হয় সুন্দর, গাঁদা হয় সুন্দর ... সকল ফুল হয় সুন্দর।" এখানে কয়েকটি নির্দিষ্ট ফুলের সৌন্দর্য (যা বিশেষ দৃষ্টান্ত) পর্যবেক্ষণ করার মাধ্যমে প্রকৃতির নিয়মানুবর্তিতা নীতির ওপর নির্ভর করে 'সকল ফুল হয় সুন্দর' নামক একটি সার্বিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া গেছে। যেহেতু এখানে কয়েকটি বিশেষ বা কম ব্যাপক আশ্রয়বাক্য থেকে একটি সার্বিক বা বেশি ব্যাপক সিদ্ধান্ত টানা হয়েছে, তাই এটি সুস্পষ্টভাবে আরোহ অনুমানকে নির্দেশ করে।
ঘ.
উদ্দীপকে যুক্তি-১ হলো 'আরোহ অনুমান' এবং যুক্তি-২ হলো 'অবরোহ অনুমান'। নিম্নে এদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও পার্থক্য আলোচনা করা হলো:
উদ্দীপকের যুক্তি-২ এ বলা হয়েছে, "সকল শিক্ষক হয় বিদ্বান, কিছু মানুষ হয় শিক্ষক $\therefore$ কিছু মানুষ হয় বিদ্বান।" এখানে একটি সার্বিক আশ্রয়বাক্য থেকে একটি বিশেষ সিদ্ধান্ত টানা হয়েছে, যা অবরোহ অনুমানের বৈশিষ্ট্য। যুক্তি-১ (আরোহ) ও যুক্তি-২ (অবরোহ) এর মধ্যকার সম্পর্ক হলো:
১. চিন্তার গতি বা দিক: যুক্তি-২ বা অবরোহ অনুমানে চিন্তার গতি নিম্নমুখী, অর্থাৎ এটি সার্বিক থেকে বিশেষের দিকে অগ্রসর হয় (সকল থেকে কিছুতে)। অন্যদিকে, যুক্তি-১ বা আরোহ অনুমানে চিন্তার গতি ঊর্ধ্বমুখী, অর্থাৎ এটি বিশেষ থেকে সার্বিকের দিকে অগ্রসর হয় (কয়েকটি ফুল থেকে সকল ফুলে)।
২. সিদ্ধান্তের ব্যাপকতা: যুক্তি-২ (অবরোহ)-এর সিদ্ধান্তটি আশ্রয়বাক্যের চেয়ে কম ব্যাপক বা সমব্যাপক হয়। কিন্তু যুক্তি-১ (আরোহ)-এর সিদ্ধান্তটি সবসময় আশ্রয়বাক্য থেকে বেশি ব্যাপক হয়।
৩. নিশ্চিততা বনাম সম্ভাব্যতা: যুক্তি-২ এ সিদ্ধান্তটি আশ্রয়বাক্য থেকে অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয় বলে সিদ্ধান্তটি সুনিশ্চিত। কিন্তু যুক্তি-১ এ বাস্তব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত টানা হয় বলে এর সিদ্ধান্ত সাধারণত সম্ভাব্য হয়ে থাকে।
৪. সত্যতার ধরন: অবরোহ অনুমান কেবল যুক্তির আকারগত বা গঠনগত সত্যতা নিয়ে আলোচনা করে। কিন্তু আরোহ অনুমান আকারগত ও বস্তুগত (বাস্তব) উভয় প্রকার সত্যতা নিয়েই আলোচনা করে।
৫. পারস্পরিক পরিপূরকতা: দৃশ্যত এদের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও এরা একে অপরের পরিপূরক। যুক্তি-২ বা অবরোহ অনুমানের যে প্রধান আশ্রয়বাক্যটি (সকল শিক্ষক হয় বিদ্বান) ব্যবহৃত হয়েছে, তা মূলত আরোহ অনুমানের মাধ্যমেই পাওয়া যায়। আবার আরোহ অনুমানের সিদ্ধান্তটি নির্ভুল কি না, তা অবরোহ অনুমানের মাধ্যমে যাচাই করা যায়।
পরিশেষে বলা যায়, জ্ঞানানুসন্ধানের ক্ষেত্রে উদ্দীপকের যুক্তি-১ এবং যুক্তি-২ পরস্পর বিরোধী নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ।