ক.
মুক্তিযুদ্ধের সময় আকবর বাহিনী মাগুরা জেলায় গঠিত হয়েছিল।
খ.
মুক্তিযুদ্ধের সময় পত্রপত্রিকার অবদান অনস্বীকার্য। বিদেশি সাংবাদিক সাইমন ড্রিং নিজের জীবন বিপন্ন করে পাকিস্তানি বাহিনীর লোমহর্ষক নির্যাতন ও গণহত্যার কথা ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় প্রতিবেদন আকারে প্রেরণ করেন। এটি ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ প্রকাশিত হয়। ২৯ মার্চ দ্য সিডনি মর্নিং হেরাল্ড লিখেছিল বেসামরিক মৃতের সংখ্যা দশ হাজার না এক লক্ষ তা আমাদের জানা নেই। ১৯৭১ পালের ২৫ মার্চের পর বাংলাদেশের মুজিবনগর থেকে সর্বপ্র৭১ দৈনিক 'জয় বাংলা' নামে পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এটি ছিল মুজিবনগর থেকে প্রকাশিত প্রথম দৈনিক পত্রিকা। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাবিনার সেনাবাহিনী ইত্তেফাক পত্রিকা অফিসসহ বহু পত্রিকা অফিসে হামলা চালায় এবং বন্ধ করে দেয় প্রকাশনা। তখন ভারতের ত্রিপুরা থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হতে শুরু করে যা জনমত গঠনে বিশেষ অবদান রাখে।
গ.
মি. 'ক' যে সরকার গঠনে অংশগ্রহণ করেছিলেন তা হচ্ছে মুজিবনগর সরকার যা গঠিত হয় ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল এবং শপথ নেয় ১৭ এপ্রিল।
এ সরকারের কর্মকান্ড ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার স্বাধীনতাকামী জনতা প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সংগ্রহের আশায় ভারতে ভিড় জমালে মুজিবনগর সরকার তাদের যাচাই-বাছাই করে ভারতীয় ও বাংলাদেশি সেনাবাহিনী দ্বারা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। তাদের অস্ত্র দিয়ে বাংলাদেশের যুদ্ধের ময়দানে পাঠায়। মুক্তিযুদ্ধকে সুসংহভাবে পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের সেনা কর্মকর্তাদের সাথে পরামর্শক্রমে মুজিবনগর সরকার যুদ্ধক্ষেত্রকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে। স্বাধীনতা যুদ্ধের চেতনাকে অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য এবং সংগ্রামী জনগণের মনোবল ঠিক রাখার জন্য 'মুজিবনগর সরকার' স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে ও পত্রপত্রিকার মাধ্যমে প্রচেষ্টা চালায়। স্বাধীন বাংলার বেতার কেন্দ্রের দেশাত্মবোধক গানগুলো এবং 'চরমপত্র' অনুষ্ঠানটি মুক্তিযোদ্ধা ও জনগণকে উদ্দীপ্ত করে তোলে। 'মুজিবনগর সরকার' নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও একটি বেসরকারি প্রশাসন গড়ে তুলেছিল। মুজিবনগর সরকার কলকাতা, দিল্লি, লন্ডন, ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক ও স্টকহোমসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ সরকারের মিশন স্থাপন এবং ওইসব স্থানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি নিয়োগ করে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে প্রচারণা ও সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে। মুজিবনগর সরকার বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে বহির্বিশ্বে বিশেষ দূত নিয়োগ করে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে বিশ্বনেতাদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে। মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বেই বাঙালিরা অর্জন করে লাল সবুজের পতাকা।
সুতরাং মি. 'ক' যে সরকার গঠনে অংশগ্রহণ করেছিলেন তার কর্মকাণ্ড বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
ঘ.
মি. 'ক'-এর স্মরণীয় অনিয়মিত বাহিনী যা মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত হয়েছিল তা প্রকৃত অর্থেই ছিল অনিয়মিত-উক্তিটি যথার্থ।
কেননা, মুক্তিযুদ্ধের সময় যুবক, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক ও সকল পর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে বিভিন্ন সেক্টরের অধীনে এ বাহিনীর সরকারি নামকরণ ছিল গণবাহিনী বা এফ.এফ, (ফ্রিডম ফাইটার বা মুক্তিযোদ্ধা)। এ বাহিনীর সদস্যদের দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণের পর একজন কমান্ডারের অধীনে তাদের নিজ নিজ এলাকায় যুদ্ধ করার জন্য প্রেরণ করা হতো। এ বাহিনীর জন্য কোনো সামরিক আইন কার্যকর ছিল না। অনিয়মিত বাহিনীর সদস্যদের কোনো বেতনভাতা দেওয়া হতো না। অনিয়মিত বাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার। উল্লিখিত বাহিনীর বাইরে আরও কয়েকটি অনিয়মিত বাহিনী ছিল। মূলত স্থানীয় ভিত্তিতে ও রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে এসব গেরিলা বাহিনী গঠিত ছিল। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে শেখ ফজলুল হক মনির নিয়ন্ত্রণাধীনে গঠিত হয় মুজিব বাহিনী। এ বাহিনীর সদস্যদের সকলে ছাত্রলীগের সদস্য। তন্মধ্যে আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, সিরাজুল আলম খান, আ স ম আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজ, নূরে আলম সিদ্দিকী প্রমুখেরা যথেষ্ট ভূমিকা পালন করেন। মুজিব বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ছিল ৬০০০। এছাড়া ন্যাপ (মোজাফফর) কমিউনিস্ট পার্টির নিজস্ব দলীয় বাহিনী ছিল। এসব বাহিনীর পাশাপাশি কাদেরিয়া বাহিনী (টাঙ্গাইল), আফসার ব্যাটালিয়ন (ভালুকা-ময়মনসিংহ), বাতেন বাহিনী (টাঙ্গাইল), হেমায়েত বাহিনী
(গোপালগঞ্জ- বরিশাল), হালিম বাহিনী (মানিকগঞ্জ), আকবর বাহিনা (মাগুরা) ও জিয়া বাহিনী (সুন্দরবন)। এসব বাহিনীর কর্মকান্ড ছিল স্বেচ্ছাসেবক, স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। কাগজে-কলমে তারা সেক্টর কমান্ডার দ্বারা পরিচালিত হলেও বাস্তবে এরা এলাকাভিত্তিতে নিয়ন্ত্রিত হতো। সুতরাং সার্বিকভাবে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত অনিয়মিত বাহিনী ছিল প্রকৃত অর্থেই অনিয়মিত।