(ক)
গৃহে পারিবারিক ভিত্তিতে স্বল্প মূলধন, সহজলভ্য কাঁচামাল ও ছোটখাটো যন্ত্রপাতির সাহায্যে পরিচালিত শিল্পই হলো কুটির শিল্প।
(খ)
চিংড়ি বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস বিধায় একে 'সাদা সোনা' বা 'White Gold' বলা হয়।
বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে, পূর্বে চিংড়ি চাষ কেবল জেলেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে এটি অনেকের কাছেই আত্মকর্মসংস্থান, অর্থ উপার্জন ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি লাভজনক উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাধারণত অভ্যন্তরীণ বাজারে চিংড়ি খাদ্যপণ্য হিসেবে কেনা-বেচা হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে হিমায়িত খাদ্যসামগ্রী হিসেবে রপ্তানি করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এর উচ্চমূল্য এবং দেশের অর্থনীতিতে এর বিশেষ অবদানের কারণে চিংড়িকে 'সাদা সোনা' বলা হয়।
(গ)
উদ্দীপকে উল্লিখিত শিল্পটি হলো কুটির শিল্প। কারণ এখানে কারিগরের তৈরি দেশীয় পণ্যের কথা বলা হয়েছে, যা পারিবারিক পরিবেশে স্বল্প মূলধন ও সহজলভ্য কাঁচামালের সাহায্যে তৈরি হয় এবং এটি দেশের অতীত ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক।
উদ্দীপকের আলোকে এই শিল্পটির গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. ন্যায্যমূল্যের অভাব: উদ্দীপকে বলা হয়েছে, পণ্যগুলো আকর্ষণীয় হলেও উৎপাদনকারীরা ন্যায্যমূল্য পায় না। কুটির শিল্পের কারিগররা সাধারণত মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করেন, ফলে লাভের সিংহভাগ মধ্যস্বত্বভোগীরা নিয়ে যান এবং প্রকৃত কারিগররা বঞ্চিত হন।
২. মূলধনের অভাব ও ঋণের সুযোগহীনতা: উদ্দীপকে উল্লেখ করা হয়েছে যে, উৎপাদনকারীরা গরিব বিধায় ঋণসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। জামানতের অভাবের কারণে তারা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সহজ শর্তে ঋণ পায় না, যা তাদের উৎপাদন বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করে।
৩. বাজারজাতকরণ সমস্যা: মূলধনের অভাব এবং সঠিক বিপণন ব্যবস্থার অভাবে তারা তাদের উৎপাদিত পণ্য উপযুক্ত বাজারে পৌঁছে দিতে পারে না, ফলে পণ্যের সঠিক দাম পাওয়া সম্ভব হয় না।
৪. কাঁচামালের স্বল্পতা ও প্রযুক্তির অভাব: কুটির শিল্পে সাধারণত সনাতন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এবং মানসম্মত কাঁচামালের উচ্চমূল্য বা স্বল্পতা এই শিল্পের অন্যতম প্রধান সমস্যা।
(ঘ)
উদ্দীপকে উল্লিখিত কুটির শিল্পের বিরাজমান সমস্যা সমাধানে সমন্বিত ও পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। আমার মতে, এই শিল্পের সমস্যা সমাধানে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে:
১. সহজ শর্তে ঋণ প্রদান: কুটির শিল্পের কারিগররা যেহেতু দরিদ্র এবং জামানতহীন, তাই তাদের জন্য বিশেষ ক্রেডিট স্কিম বা জামানতবিহীন সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে তারা মূলধনের সংকট কাটিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারবে।
২. মধ্যস্বত্বভোগী দূর করে সরাসরি বাজারজাতকরণ: কারিগররা যাতে সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারে, সেজন্য সরকারিভাবে বিভিন্ন মেলা, প্রদর্শনী এবং বিক্রয় কেন্দ্রের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে তারা পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবে।
৩. কারিগরি প্রশিক্ষণ ও আধুনিকায়ন: সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অদক্ষ কারিগরদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করতে হবে যাতে পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধি পায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যায়।
৪. কাঁচামালের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা: সুলভে মানসম্মত কাঁচামাল সরবরাহের জন্য সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড় বা স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
৫. সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রচার: কুটির শিল্প দেশের ঐতিহ্যের ধারক। তাই সরকারিভাবে এই শিল্পের প্রচার-প্রসার বৃদ্ধি করতে হবে এবং দেশীয় পণ্যের ব্যবহার উৎসাহিত করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, সঠিক পরিকল্পনা, সরকারি সহযোগিতা এবং কারিগরদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কুটির শিল্পের সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব। এতে একদিকে যেমন দারিদ্র্য দূর হবে, অন্যদিকে দেশের ঐতিহ্য সংরক্ষিত হবে এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসবে।