ক.
বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলো সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া)।
খ.
১৯৬২ সালে কিউবায় সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি স্থাপনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যে চরম উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের উপক্রম হয়েছিল, ইতিহাসে তা 'কিউবা সংকট' নামে পরিচিত।
স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে সোভিয়েত ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী রাষ্ট্র কিউবায় গোপনে পারমাণবিক মিসাইল মোতায়েন করে। যুক্তরাষ্ট্র এটি জানতে পেরে কিউবার ওপর নৌ-অবরোধ আরোপ করে এবং মিসাইল সরিয়ে নেওয়ার চরমপত্র দেয়। এর ফলে দুই পরাশক্তির মধ্যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা পারমাণবিক যুদ্ধের চরম আশঙ্কা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত তৎকালীন সোভিয়েত নেতা ক্রুশ্চেভ মিসাইল সরিয়ে নিতে রাজি হলে এই সংকটের শান্তিপূর্ণ অবসান ঘটে।
গ.
উদ্দীপকের মিলার ও ক্লাসেনের রাষ্ট্রের সাথে পাঠ্যবইয়ের স্নায়ুযুদ্ধকালীন দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন-এর সাদৃশ্য রয়েছে।
উদ্দীপকে বলা হয়েছে, দুটি শক্তিশালী দেশের মধ্যে সদ্ভাব ছিল না, তারা একে অপরকে হুমকি দিত কিন্তু সরাসরি যুদ্ধে জড়াত না। পরে একটি রাষ্ট্র ভেঙে গেলে এই দ্বন্দ্বের অবসান হয়।
পাঠ্যবইয়ের আলোকে আমরা জানি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন দুটি পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। তাদের মধ্যে আদর্শগত দ্বন্দ্বের কারণে বিশ্বব্যাপী এক চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যাকে 'স্নায়ুযুদ্ধ' $\text{(Cold War)}$ বলা হয়। তারা সরাসরি সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত না হলেও পরোক্ষভাবে সবসময় একে অপরকে হুমকি দিত, অস্ত্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতো এবং সবসময় যুদ্ধাবস্থায় থাকত। উদ্দীপকের মিলার ও ক্লাসেনের মধ্যকার ভীতিকর ও যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি মূলত এই স্নায়ুযুদ্ধকেই নির্দেশ করে। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের (উদ্দীপকের ক্লাসেনের রাষ্ট্র) পতন ঘটে এবং সেটি ভেঙে রাশিয়া, ইউক্রেনসহ ১৫টি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এর মধ্য দিয়েই দীর্ঘ স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটে। সুতরাং, উদ্দীপকের রাষ্ট্র দুটি স্পষ্টতই যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নকে নির্দেশ করে।
ঘ.
উক্ত রাষ্ট্র দুটি অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার পরোক্ষ দ্বন্দ্ব ইতিহাসে 'স্নায়ুযুদ্ধ' $\text{(Cold War)}$ নামে পরিচিত। পাঠ্যপুস্তকের আলোকে বিশ্ব রাজনীতিতে এই স্নায়ুযুদ্ধের ফলাফল বা প্রভাব নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. বিশ্বের মেরুকরণ ও সামরিক জোট গঠন: এই দ্বন্দ্বের ফলে সমগ্র বিশ্ব মূলত দুটি পরস্পরবিরোধী সামরিক ও আদর্শিক জোটে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী জোট 'ন্যাটো' $\text{(NATO)}$ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক জোট 'ওয়ারশ চুক্তি' গঠিত হয়।
২. অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও পারমাণবিক আতঙ্ক: উভয় দেশ নিজেদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য ব্যাপক অস্ত্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। দুই দেশের হাতেই পারমাণবিক অস্ত্রের বিপুল মজুত থাকায় বিশ্ব সবসময় একটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞের আতঙ্কে প্রহর গুনত।
৩. ছায়াযুদ্ধ ও আঞ্চলিক সংঘাত: সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও এই দুই পরাশক্তি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে 'প্রক্সি ওয়ার' বা ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত হয়। এর ফলে কোরিয়া যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং আফগানিস্তান সংকটের মতো রক্তক্ষয়ী আঞ্চলিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যেখানে লাখ লাখ নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায়।
৪. মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তির বিকাশ: এই দ্বন্দ্বের একটি ইতিবাচক দিকও ছিল। নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য উভয়ের মধ্যে 'স্পেস রেস' বা মহাকাশ প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এর ফলে কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ থেকে শুরু করে মানুষের চাঁদে পদার্পণসহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত হয়।
পরিশেষে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব বা স্নায়ুযুদ্ধ বিশ্বকে দীর্ঘ চার দশক ধরে এক চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে রাখলেও, এর ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষমতার এক ধরনের ভারসাম্য বজায় ছিল এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশ ঘটেছিল।