ক.
জর্জ হ্যারিসন লন্ডনে জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত সংগীত শিল্পী ছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে, বিশ্ব জনমত সৃষ্টি ও দান সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে ‘বাংলাদেশ কনসার্ট' নামে একটি কনসার্টের আয়োজন করে গান পরিবেশন করেন।
খ.
ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। প্রভাবশালী নেহের পরিবারে জন্মগ্রহণ করায় তিনি এক রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠেন। তাঁর পিতামহ মতিলাল নেহেরু ছিলেন কংগ্রেসের একজন প্রথম সারির নেতা। তাঁর পিতা জওহরলাল নেহেরু ছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। ১৯৪১ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে ইন্দিরা গান্ধী পিতার সাথে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে জওহরলাল নেহেরুর মৃত্যুর পর ভারতের রাষ্ট্রপতি তাঁকে রাজ্য সভার সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেন। তখন ইন্দিরা গান্ধী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মন্ত্রীসভার তথ্য ও প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর পর ইন্দ্রিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাছাড়া ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তিনি সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন।
গ.
উদ্দীপকের মতো আমার পাঠ্যবইয়ের ভারত সোভিয়েত ইউনিয়ন ও গ্রেটবৃটেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করেছিল। যেমন—
ভারত : ভারতের জনগণ ও সরকার প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয়, খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রশস্ত্র এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে সাহায্য করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতে বিমান হামলা চালায়। পাকিস্তানের আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ এবং ভারত সরকার মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে ‘যৌথ কমান্ড' গঠন করে । ভূটান ও ভারত ৬ ডিসেম্বর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি প্রদান করে। ভারতের বহু সৈন্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ হারান।
সোভিয়েত ইউনিয়ন : সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট পদগর্নি বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধ করার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে চিঠি দেন। তাছাড়া ৩রা ডিসেম্বর চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হলে সোভিয়েত ইউনিয়ন যুদ্ধ বিরতি বিলম্বিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। উদ্দেশ্য ছিল যৌথ বাহিনী যাতে সামরিক বিজয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও সুযোগ পায় এবং তাদের এ উদ্দেশ্য সফল হয়।
গ্রেটবৃটেন : ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বৃটেনের প্রচার মাধ্যমগুলো বাঙালিদের ওপর পাকবাহিনীর নির্মম নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে বিশ্ব জনমত জাগ্রত করে তোলে । তাছাড়া লন্ডনে জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত সংগীত শিল্পী জর্জ হ্যারিসন কর্নসাটের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য 'সাহাজ্যের ব্যবস্থা করেন। তাছাড়া অস্ট্রেলিয়া, পশ্চিম জার্মানী, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান ও কানাডার প্রচার মাধ্যমগুলো পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত সৃষ্টিতে সাহায্য করে। ইরাক বাংলাদেশের মুজিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন জানায়।
ঘ.
উক্ত দেশের অর্থাৎ ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও গ্রেটবৃটেনের সহযোগিতামূলক কর্মকাণ্ডই বাংলাদেশের বিজয়কে ত্বরান্বিত করে।
ভারত সরকার ২৫ মার্চ থেকে সংঘটিত পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার নিন্দা করে। গণহত্যার হাত থেকে বাঁচতে সীমান্ত পেরিয়ে আসা প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে ভারত আশ্রয় দেয় এবং তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়। ভারতের মাটিতে এপ্রিলের শেষ দিকে বাঙালি যুবকদের সশস্ত্র ট্রেনিং দেওয়া শুরু হয় যা নভেম্বর মাস পর্যন্ত চলে। পাশাপাশি কলকাতায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার পরিচালনা ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র' নামে এ সরকারের বেতার কেন্দ্র স্থাপনে ভারত সহায়তা করে। এছাড়া ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ বিভিন্ন মন্ত্রী নেতা ও কর্মকর্তারা বিদেশে সফর করে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন। ৩ ডিসেম্বর ভারতের বিমান ঘাঁটিতে পাকিস্তান বিমান হামলা চালালে চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হয়। এ সময় পশ্চিম পাকিস্তান সীমান্তেও পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের পক্ষে ভূমিকা রেখেছিল। এপ্রিলের শুরুতে সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট পদগর্নি বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধ করার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে চিঠি দেন। ৩ ডিসেম্বর চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হলে সোভিয়েত ইউনিয়ন যুদ্ধবিরতি বিলম্বিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। উদ্দেশ্য ছিল যৌথবাহিনীকে ঢাকা দখল করার পূর্ব মহূর্ত পর্যন্ত যেকোনো প্রকারে যুদ্ধবিরতির পদক্ষেপকে ঠেকিয়ে রাখাই নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটোদানের উদ্দেশ্য ছিল। তাদের এ উদ্দেশ্য সফল হয়। তাছাড়া গ্রেটবৃটেত্রের প্রচার মাধ্যমগুলো বাংলাদেশের বিজয়কে ত্বরান্বিত করে। বৃটেনের বিখাত শিল্পী জর্জ হ্যারিসন কনসার্টের মাধ্যমে বিশ্ব জনমত গঠন ও দান সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। পরিশেষে বলা যায় যে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মিত্ররাষ্ট্র ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও গ্রেট বৃটেন অকৃত্রিমভাবে সাহায্য করে। বাংলাদেশের বিজয়কে ত্বরান্বিত করে।