ক.
উমাইয়া খলিফা আল ওয়ালিদের শাসনামলে স্পেন মুসলিম সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।
খ.
খলিফা আল ওয়ালিদের পশ্চিমাঞ্চলীয় শাসক ও সেনাপতি ছিলেন মুসা বিন নুসাইর। তিনি ৭১১ খ্রিস্টাব্দে বীরশ্রেষ্ঠ সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে স্পেনে একটা বাহিনী প্রেরণ করে। মাত্র ১২,০০০ সৈন্যসহ তারিক বিন জিয়াদ জুলিয়ানের চারটি নৌযানে অবতরণ করেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে তারিক স্পেনের রাজা রডারিকের ১,০০,০০০ সৈন্যের মোকাবিলা করেন। ওয়াদী আল বেকার নিকটবর্তী সারিসে মুসলিম ও রডারিকের গথিক বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। ইতিহাসে এটাই 'ওয়াদি আল, বেকার যুদ্ধ' নামে পরিচিত। এ যুদ্ধে রডারিক শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন এবং মৃত্যুবরণ করেন। ফলে স্পেনে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন হয়। আর এ কারণেই তারিক বিন জিয়াদ ইসলামের ইতিহাসে বিখ্যাত।
গ.
উদ্দীপকে জাওয়াদ ফরাজির সাথে স্পেনের উমাইয়া শাসক আব্দুর রহমান আদ-দাখিলের সাথে মিল রয়েছে।
আব্বাসি বংশের প্রথম খলিফা আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ যখন উমাইয়া বংশকে ধ্বংস করার জন্য উমাইয়াদের হত্যা শুরু করে, তখন সৌভাগ্যবশত প্রথম আব্দুর রহমান প্রাণে বেঁচে যান এবং স্পেনে গিয়ে বিপুল সমর্থন নিয়ে স্পেনের শাসনকর্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্পেনের রাজধানী কর্ডোভা দখল করেন। এরপর বেশ কয়েকটি যুদ্ধে জয়লাভ করে তিনি সম্পূর্ণ স্পেনের অধিকারী হন। তিনি সকল বাধা বিপত্তির অবসান ঘটিয়ে স্পেনে উমাইয়া বংশকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন। প্রথম আব্দুর রহমান কর্ডোভাকে মনোরম অট্টালিকা ও উদ্যানে সুশোভিত করেছিলেন। মোট ৩২ বছর স্পেনে রাজত্ব করে তিনি পরলোক গমন করেন। আব্দুর রহমান স্পেনে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়ও একে সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে সুশাসনে মনোযোগী হন।
তিনি ছিলেন প্রশাসনিক কাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যক্তি। তিনি শাসনকার্যে নানারকম উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ, সামরিক বাহিনী সুসংগঠিতকরণ, বিভিন্ন জনহিতকর কার্যাবলি সম্পাদনের, মাধ্যমে স্পেনে মুসলিম শাসনের ভিত সুদৃঢ় হয়।
ঘ.
উদ্দীপকের ঘটনা উমাইয়া শাসক আব্দুর রহমান আদ দাখিলের শাসনের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
উক্ত শাসক বিশেষ কৃতিত্বের অধিকারী। স্পেনের উমাইয়া শাসকদের মধ্যে আবদুর রহমান আদ-দাখিল নিঃসন্দেহে সর্বাপেক্ষা সুদক্ষ ও গুণবান ছিলেন। তিনি রাজ্যকে গোলযোগপূর্ণ কলহে ছিন্নবিচ্ছিন্ন, বিভিন্ন বংশের সামন্ত সরদারগণের মধ্যে বিভক্ত, অরাজকতা, অন্তর্বিবাদে বিপর্যস্ত এবং উত্তরাঞ্চলের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়সমূহের বিরামহীন আক্রমণে বিপন্ন দেখে অসংখ্য বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও তিনি আন্দালুসিয়াকে রক্ষা করে একে পূর্বাপেক্ষা বৃহদায়তন ও শক্তিশালী করেছিলেন।
এরূপ অভ্যন্তরীণ বিপদ থেকে স্পেনকে মুক্ত করে তিনি বহিঃশত্রুর দিকে দৃষ্টি আরোপ করেন। উত্তরাঞ্চলের খ্রিস্টানরা তার রাজ্য বারবার আক্রমণ করলে তিনি তাদেরকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে তাদের শক্তি খর্ব করেন। একারণে তাকে স্পেনের রক্ষাকারী বলা হয়। তার শাসনামলে তিনি নলযোগে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করে কৃষিকার্যের ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন। তাছাড়াও শিল্পকলা, ব্যবসায় বাণিজ্যেও তার কৃতিত্ব লক্ষণীয়। তার সময়ে সাম্রাজ্যের সর্বত্র শান্তি-শৃঙ্খলা বিরাজমান ছিল। এসময় বণিক ও পথিকগণ সামান্যতম আশঙ্কা ব্যতীত নির্বিঘ্নে ভ্রমণ করতে পারত। সমসাময়িক ঐতিহাসিকদের বিবরণী থেকে জানা যায়, জনসাধারণের প্রায় সকলেই না হেঁটে ঘোড়ায় চড়ে যাতায়াত করত। তার শাসনকালে আর্থিক সমৃদ্ধির সাথে সাথে শিক্ষা সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও ব্যাপক উন্নতি দেখা দেয়। হিস্ট্রির মতে, আব্দুর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতাই মুসলিম স্পেন বিশ্ব সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। তিনি সাম্রাজ্যের সর্বত্র স্কুল, পাঠাগার ও এতিমখানা স্থাপন করেন। তার প্রতিষ্ঠিত কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় পাশ্চাত্যের শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। তার রাজত্বকালে স্থাপত্য শিল্পেরও প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছিল। এসময় রাজধানী কর্ডোভাতে ২১টি মাদ্রাসা, ৩০০ মসজিদ, ১০০ প্রাসাদ, ১,০০,০০০ গৃহ এবং ৩৮০টি হাম্মামখানা ছিল।
তাই বলা যায়, উমাইয়া আমির আবদুর রহমান আদ-দাখিল স্পেনের উন্নয়নে যথেষ্ট কৃতিত্বের দাবিদার।