ক.
লোকরীতি হচ্ছে সমাজের আদর্শ বা মানসম্পন্ন আচরণ, যা সমাজের সদস্যদের জন্য অবশ্য পালনীয় লোকাচার।
খ.
মেধা হলো অবস্তুগত সংস্কৃতি। অবস্তুগত সংস্কৃতি হলো সেসব ধারণাগত উপাদান যা স্পর্শ করা যায় না, যেমন- জ্ঞান, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, রীতিনীতি, ভাষা, প্রথা, মেধা ও দক্ষতা। মেধা যেহেতু মানুষের জ্ঞান, বুদ্ধি ও প্রতিভার একটি রূপ যা কোনো বস্তু নয়, তাই এটি অবস্তুগত সংস্কৃতির অংশ। একজন বিজ্ঞানী বা শিল্পীর মেধা তার সৃষ্টির পেছনে কাজ করে, কিন্তু মেধা নিজেই একটি অদৃশ্য ধারণা।
গ.
উদ্দীপকে সমাজবিজ্ঞানের একাধিক শাখার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। নিচে সেগুলো ব্যাখ্যা করা হলো-
নগর সমাজবিজ্ঞান: উদ্দীপকে দেখা যায়, ভৈরব নদীর তীরে শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে, যা আশেপাশের গ্রাম থেকে মানুষকে কাজের জন্য আকর্ষণ করছে। এর ফলে অফিস আদালত, স্কুল, কলেজ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এটি নগরায়ণ প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে। নগর সমাজবিজ্ঞান নগরের উৎপত্তি, বিকাশ, সামাজিক সংগঠন এরং সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করে।
শিল্প সমাজবিজ্ঞান: উদ্দীপকে কলকারখানা, সেখানকার কর্মীদের জীবন এবং কর্ম পরিবেশের কথা বলা হয়েছে। শিল্প সমাজবিজ্ঞান শিল্প প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক, কর্মক্ষেত্রের সামাজিক সম্পর্ক ও সমস্যা নিয়ে গবেষণা করে।
পরিবেশ সমাজবিজ্ঞান: কলকারখানার বর্জ্য, যানজট, শব্দ দূষণ ও ধুলোবালির কারণে পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে তার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। পরিবেশ সমাজবিজ্ঞান মানুষের কর্মকান্ড এবং পরিবেশের মধ্যকার সম্পর্ক, পরিবেশগত সমস্যা এবং তার সামাজিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করে।
অপরাধ সমাজবিজ্ঞান: উদ্দীপকের শেষ অংশে ছোটোখাটো চুরি ও ছিনতাইয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অপরাধ সমাজবিজ্ঞান সমাজের মধ্যে সংঘটিত অপরাধ এর কারণ এবং প্রতিকার নিয়ে গবেষণা করে।
ঘ.
হ্যাঁ, উদ্দীপকে বর্ণিত সমস্যাগুলো থেকে প্রতিকার পেতে সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান অপরিহার্য বলে আমি মনে করি।
সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিতকরণ: সমাজবিজ্ঞান কেবল পৃষ্ঠতলের সমস্যা দেখায় না, বরং এর গভীরে গিয়ে মূল কারণ খুঁজে বের করে। উদ্দীপকে বর্ণিত সমস্যা, যেমন- যানজট, দূষণ ও চুরি-ছিনতাই- এগুলো কেবল পরিবেশগত বা আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, বরং এগুলো নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট সামাজিক পরিবর্তনের ফল। সমাজবিজ্ঞান এ পরিবর্তনগুলো বিশ্লেষণ করে দেখায় কেন গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষগুলো নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে পারছে না, কেন তাদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে এবং কেন নগরের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
পরিকল্পিত নগরায়ণ: অপরিকল্পিত নগরায়ণ এ সমস্যাগুলোর অন্যতম প্রধান কারণ। সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান ব্যবহার করে পরিকল্পিত নগরায়ণ সম্ভব। এর মাধ্যমে নগর পরিকল্পনাবিদরা নিশ্চিত করতে পারেন যে, নতুন গড়ে ওঠা অঞ্চলে পর্যাপ্ত স্কুল, হাসপাতাল এবং অন্যান্য সামাজিক সুবিধা থাকবে, যাতে অপরাধ বা অন্যান্য সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়।
জনসচেতনতা বৃদ্ধি: কলকারখানার বর্জ্য ও দূষণের মতো সমস্যা সমাধানে শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। সমাজবিজ্ঞান জনগণকে সচেতন করার উপায় নির্দেশ করে দেয়, যাতে তারা নিজেরা পরিবেশ রক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।
সামাজিক সম্প্রীতি ও সংহতি স্থাপন: গ্রাম থেকে আসা নতুন কর্মীরা যখন নগরে আসে, তখন তারা একটি নতুন সামাজিক কাঠামোতে প্রবেশ করে। এতে অনেক সময় তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি হয়, যা অপরাধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। সমাজবিজ্ঞান এ বিচ্ছিন্নতাকে বিশ্লেষণ করে এবং সামাজিক সম্প্রীতি ও সংহতি বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দেয়।
সুতরাং, উদ্দীপকে বর্ণিত সমস্যাগুলো একটি সামগ্রিক সামাজিক সংকটের অংশ। এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সমাজবিজ্ঞানের পদ্ধতিগত জ্ঞান ব্যবহার করে সমস্যার সামাজিক দিকগুলো বিশ্লেষণ করা এবং সে অনুযায়ী কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা অপরিহার্য।