ক.
দ্বি-জাতি তত্ত্বের প্রবস্তা হলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।
খ.
প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন বলতে প্রদেশগুলোর নিজস্ব স্বাধীন শাসনব্যবস্থাকে বোঝায়।
১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রবর্তন করা হয়েছিল। এতে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন তিনটি নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। প্রথমত, সংবিধান অনুযায়ী প্রাদেশিক সরকারের ওপর ন্যস্ত বিষয়গুলোর ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না। দ্বিতীয়ত, প্রদেশগুলোতে দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রদেশ আত্মনির্ভরশীল হবে। মোটকথা, প্রদেশগুলোর সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা প্রাপ্তি এবং প্রাদেশিক সরকারের দায়িত্বশীল হওয়াই হলো প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন।
গ.
উদ্দীপকে ব্রিটিশ ভারতের কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নামক রাজনৈতিক দল দুটির কথা বলা হয়েছে।
ভারতীয় উপমহাদেশে ১৮৮৫ সালের শেষের দিকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস নামে একটি রাজনৈতিক দলের সৃষ্টি হয়। উপমহাদেশে সর্বপ্রথম উদ্ভূত এ রাজনৈতিক দলটি ভারতের রাজনৈতিক জীবনে এক নতুন যুগের সূচনা করে। উদ্দীপকের প্রথমেই এ দলটিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।
উদ্দীপকের প্রথমে নির্দেশিত দলটি ভারতীয়দের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য ১৮৮৫ সালে গঠিত হয়। প্রকৃতপক্ষে এ দলটিকে অর্থাৎ কংগ্রেসকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনৈতিক জীবনে গতিসঞ্চার হয়। এটি প্রধান জাতীয়তাবাদী সংস্থায় পরিণত হয়ে ভারতীয়দের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয়। তবে এ দলটি তার মূল আদর্শ অর্থাৎ অসাম্প্রদায়িকতার পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে একচেটিয়াভাবে হিন্দুদের পক্ষে কাজ করে। এ অবস্থায় মুসলমানরা স্বীয় দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য মুসলিম লীগ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে। উদ্দীপকের দ্বিতীয় রাজনৈতিক দলটিতে মুসলিম লীগের প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে। তিনটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এ দলটি গঠিত হয়েছিল। যথা: ১. ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ভারতের মুসলমানদের আনুগত্য বৃদ্ধি করা এবং ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক গৃহীত কোনো ব্যবস্থা সম্পর্কে তাদের কোনো ভুল ধারণার সৃষ্টি হলে তা দূর করা। ২. ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা এবং তার অগ্রগতি সাধন। এদের অভাব-অভিযোগ ও আকাঙ্ক্ষার কথা শ্রদ্ধার সাথে সরকারের কাছ উত্থাপন করা। ৩. ভারতীয় অন্যান্য সম্প্রদায়ের প্রতি মুসলমান জনগণের মধ্যে যেন বিদ্বেষ সঞ্চার না হয় তার ব্যবস্থা করা এবং তাদের সাথে সম্ভাব গড়ে তোলা।
ঘ.
ভারত বিভক্তিতে উক্ত দল দুটি তথা কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
ভারতীয়দের দাবি-দাওয়া আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে ১৮৮৫ সালে সর্ব ভারতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হলেও এটি হিন্দুঘেঁষা নীতি গ্রহণ করে। হিন্দুদের স্বার্থ আদায়ে তৎপর এ সংগঠনের আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে ১৯০৬ সালে মুসলমানদের আলাদা রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে মুসলিম লীগ আত্মপ্রকাশ করে।
ব্রিটিশ পৃষ্ঠপোষকতায় আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল বলে প্রথম পর্যায়ে কংগ্রেস সরকারের সাথে সহযোগিতা ও নরমপন্থা অবলম্বন করে। কিন্তু পরবর্তী ঘটনা-প্রবাহের প্রেক্ষিতে নানামুখী কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে এটি ভারতীয় নবচেতনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ফলে সরকার কংগ্রেসকে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে মনে করতে থাকে। কংগ্রেস প্রথমদিকে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় সরকারের কাছে থেকে দাবি-দাওয়া আদায়ের চেষ্টা করে। তবে সময়ের দাবি মোতাবেক কংগ্রেস ভারতে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়। ভারতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বেই ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা অর্জিত হয়। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অগ্রণী ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের মাধ্যমে সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ভারতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে স্থায়ী আসন করে নেয়।
মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গতি পরিবর্তনকারী তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এ সংগঠন প্রতিষ্ঠা মুসলমানদের মনে আত্মজাগরণের সৃষ্টি করে। ফলে ভারতের রাজনৈতিক, আর্থ- সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে তাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়। মুসলিম লীগের ব্যানারে ভারতীয় রাজনীতিতে মুসলমানদের সংগঠিত শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের ফলে তাদের ন্যায়সংগত দাবি-দাওয়া আদায় সহজ হয়। পৃথক নির্বাচনের দাবিসহ মুসলমানদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করায় মুসলিম লীগের জনসমর্থন ক্রমশ বৃদ্ধি পায় এবং ৪০ বছরের মধ্যে এটি ব্যাপক জনসমর্থিত রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হয়। বিশ শতকের চল্লিশের দশকে হিন্দু-মুসলিম তিক্ত সম্পর্কের পটভূমিতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ 'দ্বি-জাতিতত্ত্ব' উপস্থাপন করলে এটি মুসলিম লীগের দাবিতে পরিণত হয়। যার শেষ পরিণতি হলো ভারত বিভক্তি ও স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি। পরিশেষে বলা যায়, উদ্দীপকে ইঙ্গিতকৃত রাজনৈতিক দল দুটি অর্থাৎ মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস ভারতের জনমনে স্বাধিকার চেতনার জন্ম দেয়। আর এই চেতনার মধ্য দিয়েই ভারত বিভক্তি ঘটে।