ক.
১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
খ.
মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধের পক্ষে বিদেশে তহবিল সংগ্রহ ছিল মুজিবনগর সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ তৎপরতা। ১৯৭১ সালে ৮ মে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অ্যাকশন কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের জরুরি মিটিং- এ মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে 'বাংলাদেশ ফান্ড' নামে একটি। তহবিল গঠন করা হয়। এ ফান্ড ৩,৭৬,৫৬৮ পাউন্ড পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগ্রহ করেন, যা সরাসরি বাংলাদেশ সরকার গ্রহণ করেছিল। এছাড়া বাংলাদেশ সরকার বাহরাইনের বাংলাদেশ ক্লাব হতে ১৪৯৭.৫৭ পাউন্ড, কাতারের বাংলাদেশ শিক্ষা কেন্দ্র হতে ৩১০০.১৯ পাউন্ড, লিবিয়ার বাংলাদেশ শিক্ষা কেন্দ্র হতে ২৩৮২.৪২ পাউন্ড সরাসরি গ্রহণ করেছিল। জাতিসংঘের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র হতে ৮,৯১,৪৭,০০০ ডলার, যুক্তরাজ্য হতে ৩,৮১,১২,১৩২ ডলার, কানাডা হতে ২,০২,৬০,৩০৭ ডলার, সোভিয়েত ইউনিয়ন হতে ২,০০,০০,০০০ ডলার সাহায্য গ্রহণ করেছিল।
গ.
নূরুল ইসলামের সামনে ভবেরপাড়া গ্রামে শপথ নিয়েছিল বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার (মুজিবনগর সরকার)। মুজিবনগর সরকার গঠিত হয় ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল। আর শপথ গ্রহণ করেন ১৭ এপ্রিল। ১৯৭০ সালের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে এ সরকার গঠন করা হয়। এ সরকারের গঠন ছিল নিম্নরূপ-
১. রাষ্ট্রপতি- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ২. উপ ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ৩. প্রধানমন্ত্রী- তাজউদ্দীন আহমদ, ৪. অর্থমন্ত্রী- এম মনসুর আলী, ৫. স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী- এএইচএম কামারুজ্জামান, ৬. পররাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ। মুজিবনগর সরকারকে উপদেশ ও পরামর্শ প্রদানের জন্য একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ভাসানী ন্যাপ) মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (মোজাফফর ন্যাপ) অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ, কমিউনিস্ট পার্টির কমরেড মণি সিং, জাতীয় কংগ্রেসের শ্রী মনোরঞ্জন ধর, তাজউদ্দীন আহমদ (বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী) ও খন্দকার মোশতাক আহমেদ (বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রী)-কে নিয়ে মোট ৬ সদস্যবশিষ্ট উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়। কর্নেল (অব.) এমএজি ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি নিয়োগ দিয়ে গোটা বাংলাদেশকে ১১টি সামরিক সেক্টরে বিভক্ত করেন মুজিবনগর সরকার। এ সরকার বেসামরিক প্রশাসন ব্যবস্থা চালু করেন।
ঘ.
উক্ত সরকার অর্থাৎ নূরুল ইসলামের সামনে শপথ গ্রহণ করা মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য গঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার। এ সরকার শপথ গ্রহণ করে ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমা (বর্তমান জেলা) বৈদ্যনাথ তলার অন্তর্গত ভবেরপাড়া (বর্তমান, মুজিবনগর) গ্রামে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি করে সরকার গঠন করা হয়। আর উক্ত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব অর্পিত হয় তাজউদ্দীন আহমদের ওপর। বাংলাদেশের প্রথম সরকার দেশি-বিদেশি সাংবাদিকের সামনে শপথ গ্রহণ করে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব পালন শুরু করে।
এ শপথ অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠের মাধ্যমে ২৬ মার্চ হতে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। মুজিবনগর সরকার গঠনের পূর্ব পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং অনেকটা অপরিকল্পিত। মুজিবনগর সরকারের প্রচেস্টায় আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী আর এম.এ জি ওসমানী প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত হন। মুজিব সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের সভাপতিত্বে সেক্টর কমান্ডারদের অধিবেশনের সীমানা চিহ্নিতকরণ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গেরিলা ঘাঁটি স্থাপন ইত্যাদি রণনীতি প্রণয়ন করা হয়। বাংলার শোষিত, নিপীড়িত ও নির্যাতিত জনতার মুক্তির বাসনাকে সঠিক খাতে প্রবাহিত করে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সমর্থনের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করা ছিল মুজিবনগর সরকারের স্মরণীয় সাফল্য ও কৃতিত্ব। সর্বোপরি মুক্তিবাহিনী গঠন, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ব্যবস্থাপনা, যুদ্ধ পরিচালনাসংক্রান্ত বিষয়াদি, মুক্তিযুদ্ধের প্রচার, স্বাধীনতাবিরোধী তৎপরতা মোকাবিলা ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মত্মসমর্পণসহ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে মুজিবনগর সরকারের অবদান সুস্পষ্ট।
সুতরাং মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এক উজ্জ্বল অধ্যায়- উক্তিটি সঠিক ও তাৎপর্যপূর্ণ।