ক.
মানুষের কর্মকাণ্ড ও গুণাবলির সাথে ভৌগোলিক পরিবেশের মধ্যকার সম্পর্কের প্রকৃতি ও বিন্যাস নিয়ে যে শাস্ত্র আলোচনা করে তাকে মানব ভূগোল বলে।
খ.
পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন পরিবেশ দেখা যায়। প্রতিটি স্থানের পরিবেশ সেখানকার মানুষদের জন্য কিছু সম্ভাবনার দরজা উন্মুক্ত করে। এ সম্ভাবনাগুলোর ব্যবহার মানুষ তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী করে। এখানে প্রকৃতির পরিবর্তে মানুষকে সক্রিয় ভাবা হয় এবং মানুষের উপরে গুরুত্বারোপ করা হয়। প্রকৃতির দায়িত্ব হলো কেবল সম্ভাবনার দিকগুলো উন্মুক্ত করা। এ কারণে এ মতবাদকে সম্ভাবনাবাদ বলে।
গ.
উদ্দীপকে ভূগোলের একটি শাখা মানব ভূগোল সম্পর্কে বলা হয়েছে।
উক্ত মানব ভূগোলের বিষয়বস্তু সম্পর্কে নিম্নে আলোকপাত করা হলো-
মানব জনসংখ্যা বিষয়ক: এখানে জনসংখ্যার অবস্থান, বণ্টন, বিন্যাস ধারা, জন কাঠামো ও গঠন বিন্যাস, মানব স্থানান্তর তথা অভিগমন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও পরিবর্তন, পেশা ও কর্ম কাঠামো, মানব বসতি ও পরিবহন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে এ অংশে আলোচনা করা হয়েছে।
পরিবেশ বিষয়ক: মানব ভূগোলের এ অংশে পরিবেশের বিশদ বর্ণনা এবং মানুষের জীবনধারণের ওপর পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান কীভাবে প্রভাব বিস্তার করছে তা আলোচিত হয়।
অর্থনৈতিক বিষয়বস্তু: মানব ভূগোলের এ অংশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসমূহ; যেমন- পশুপাখি শিকার, মৎস্য আহরণ, বনজ সম্পদ সংগ্রহ বিষয়ক কর্মকান্ড আলোচনা করা হয়।
উৎপাদনমূলক কর্মকান্ড: মানব ভূগোলের এ অংশে কৃষিকাজ, পণ্য উৎপাদন প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
উত্তোলন বিষয়ক কর্মকান্ড: মানব ভূগোলের এ অংশে বালি ও মাটি খনন, নুড়িপাথর উত্তোলন, তেল, কয়লা ও গ্যাসসহ বিভিন্ন খনিজ সম্পদ আহরণ ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সংস্কৃতি ও সভ্যতা বিষয়ক: মানুষের উৎপত্তি, বিবর্তন ও কর্মকাণ্ড অর্থাৎ নৃতাত্ত্বিক বিষয়াবলি মানবজাতির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য যেমন-দৈহিক গড়ন, গায়ের রং, চোখ ও চুলের বর্ণনা ইত্যাদি। তাছাড়া ভাষা, জীবাশ্ম তত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, শিলালিপি, সংস্কৃতির ধরন, সাংস্কৃতিক জগৎ, বিনোদন প্রভৃতি বিষয়গুলো মানব ভূগোলের বিষয়বস্তু হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ক: শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও বেকারত্ব, সামাজিক রীতিনীতি, ধর্মীয় ও জাতিগত, রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা, জাতিগত বিন্যাস, রাষ্ট্র জোট ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ জাতিসংঘ প্রভৃতি যাবতীয় বিষয় মানব ভূগোলের বিষয়বস্তু হিসেবে অন্তর্ভুক্ত।
সুতরাং উপরোল্লিখিত প্রতিটি বিষয়ই মানবীয় বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত অর্থাৎ মানব সম্পৃক্ত; যা প্রকৃতি ও পরিবেশের মধ্যে অনেক বৈচিত্র্যতা এনে দেয়, এগুলো মানব ভূগোলের বিষয়বস্তু হিসেবে পরিগণিত হয়।
ঘ.
উদ্দীপকে মানব ভূগোলের কয়েকটি শাখা রাজনৈতিক ভূগোল, জনসংখ্যা ভূগোল, বসতি ভূগোল, অর্থনৈতিক ভূগোল, পরিবহন ভূগোল, সাংস্কৃতিক ভূগোল প্রভৃতি উল্লেখ করা হয়েছে। উক্ত শাখাসমূহ অধ্যয়নের গুরুত্ব আলোচনা করা হলো-
মানব ভূগোল ভূগোলের একটি শাখা, যা মানুষের জীবনের সাথে সম্পর্কিত। এখানে মানব সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
পৃথিবীর প্রায় সমগ্র ভূভাগ বিভিন্ন রাষ্ট্রের অন্তর্গত। প্রায় ৫/৬ বছর পূর্বে প্রথম নগর সভ্যতার পত্তন হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। সেই রাষ্ট্রের আকার, আয়তন, ভৌগোলিক অবস্থান, রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, অধীনতা, রাষ্ট্র সৃষ্টির ইতিহাস, রাষ্ট্রের সম্পদ, অর্থনীতি, আইন-কানুন প্রভৃতি বিস্তারিত অনুসন্ধান ও গবেষণা
কাজ মানব ভূগোলের শাখা রাজনৈতিক ভূগোলের মধ্যে সম্পন্ন করে।
রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো জনগণ। বর্তমান সময়ে জনসংখ্যার জনমিতিক উপাদান, অভিগমনের কারণ, ধরন, জন্মাহার, মৃত্যুহার, জনসংখ্যার ঘনত্ব, জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধির হার প্রভৃতি বিষয় নিয়ে মানব ভূগোলের অন্য আরেকটি শাখা জনসংখ্যা ভূগোলের পাঠের মাধ্যমে জানতে পারি।
মানুষ সামাজিক জীব। এরা একে অপরের সাথে বসবাস করে থাকে।
আর এজন্য তারা বসতি নির্মাণ করে থাকে। প্রাচীনকাল হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মাধ্যমে আধুনিক গ্রামীণ ও নগর বসতির উদ্ভব হয়। সেসব বসতি কীভাবে হলো তা এ শাখায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যেমন- বসতির ধরন, বিন্যাস, গ্রামীণ বসতি ও শহুরে বসতি, নগরায়ণের ধারা, অতিরিক্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে বসতির কী ধরনের সমস্যা হয় তার বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধান বসতি ভূগোল অধ্যয়নে জানতে পারি।
মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ভিত্তি রচিত হয়। যে কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পশ্চাদভূমি, কোন অঞ্চলে কোন ধরনের বাণিজ্য রয়েছে আমরা অর্থনৈতিক ভূগোল পাঠে জানতে পারি।
পরিবহনের মাধ্যমে মানুষ বিভিন্ন কর্মকান্ডের জন্য একস্থান থেকে অন্যস্থানে কিংবা একদেশ হতে অন্যদেশে যাতায়াত করে। একারণে কোন দেশের পথ কেমন প্রকৃতির তা মানব ভূগোলের অন্তর্গত পরিবহন ভূগোল অধ্যয়নে জানতে পারি।
সংস্কৃতি হচ্ছে মানবজীবনের দর্শন। অর্থাৎ মানুষের মনোভাব, বিশ্বাস,
বিচার ও মূল্যবোধ, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, নৈতিকতা, ভদ্রতা, শিষ্টাচার বিধি, ভাষা, ধর্ম, সাংস্কৃতিক অঞ্চল প্রভৃতি বিষয়গুলো সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে সাংস্কৃতিক ভূগোল অধ্যয়ন করা অত্যাবশ্যক।
সুতরাং বলা যায় যে, মানবভূগোলর উল্লিখিত শাখাসমূহ যা অধ্যয়ন করার মাধ্যমে একজন মানুষ মানব জীবন পরিচালনা করার জন্য যতটুকু জ্ঞান প্রয়োজন তার বেশির ভাগ জ্ঞানই পেয়ে থাকে। তাই উক্ত শাখাসমূহের অধ্যয়নের গুরুত্ব অপরিসীম।