(ক)
পৌরনীতি হলো জ্ঞানের সেই শাখা, যা নাগরিকের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এবং স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নাগরিকের অধিকার, কর্তব্য ও রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের আলোচনা করে।
(খ)
পৌরনীতিকে নাগরিকতা বিষয়ক বিজ্ঞান বলা হয় কারণ এই শাস্ত্রের মূল আলোচ্য বিষয় হলো নাগরিকতা। নাগরিকের অধিকার, কর্তব্য এবং রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের সম্পর্ক নিয়ে এখানে বিজ্ঞানসম্মত ও সুশৃঙ্খল আলোচনা করা হয়। এটি নাগরিককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে এবং তাকে একজন আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তাই নাগরিক জীবনের তাৎপর্য বুঝতে এবং নাগরিকতার স্বরূপ বিশ্লেষণে পৌরনীতি অপরিহার্য, এজন্য একে নাগরিকতা বিষয়ক বিজ্ঞান বলা হয়।
(গ)
উদ্দীপকে সাদেকের বড় বোন তাকে 'পৌরনীতি ও সুশাসন' বিষয়টি পড়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
পৌরনীতি ও সুশাসন বিষয়ের পরিধি ও বিষয়বস্তু অত্যন্ত ব্যাপক। এর প্রধান আলোচ্য বিষয়গুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. নাগরিকতা: পৌরনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো নাগরিকতা। এখানে নাগরিকের অর্থ, প্রকৃতি, নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
২. রাষ্ট্র ও সরকার: রাষ্ট্রের উৎপত্তি, প্রকৃতি, উদ্দেশ্য এবং সরকারের বিভিন্ন বিভাগ (আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ), সংবিধানের শ্রেণিবিভাগ ও শাসনতান্ত্রিক কাঠামো এই বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত।
৩. রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান: রাজনৈতিক দল, জনমত, নির্বাচন এবং এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা পৌরনীতির আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৪. নাগরিক জীবনের বিভিন্ন রূপ: পৌরনীতি নাগরিকের স্থানীয় রূপ (যেমন: পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন), জাতীয় রূপ (যেমন: জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিসভা) এবং আন্তর্জাতিক রূপ (যেমন: জাতিসংঘ, ওআইসি) নিয়ে আলোচনা করে।
৫. আইন ও সামাজিক মূল্যবোধ: আইন, স্বাধীনতা, সাম্য ও ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা, প্রকৃতি এবং এদের পারস্পরিক সম্পর্ক এই বিষয়ের অন্যতম আলোচ্য বিষয়।
৬. সময়ের প্রেক্ষাপট: এটি নাগরিকের অতীতের অধিকার ও কর্তব্য পর্যালোচনার মাধ্যমে বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণ করে এবং ভবিষ্যৎ নাগরিক জীবনের দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
(ঘ)
উদ্দীপকে ইঙ্গিতকৃত বিষয় অর্থাৎ 'পৌরনীতি ও সুশাসন'-এর সাথে 'ইতিহাস'-এর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও নিবিড়। পৌরনীতি ও ইতিহাস উভয়ই সামাজিক বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ শাখা এবং তারা একে অপরের পরিপূরক।
পৌরনীতি ও ইতিহাসের পারস্পরিক সম্পর্কের বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:
প্রথমত, ইতিহাস হলো মানবসমাজের বিবর্তনের একটি ধারাবাহিক সংকলন, আর পৌরনীতি সেই বিবর্তনের আলোকে নাগরিক ও রাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণ করে। ইতিহাস ছাড়া পৌরনীতি ভিত্তিহীন এবং পৌরনীতি ছাড়া ইতিহাসের আলোচনা অনেক ক্ষেত্রে নিষ্ফল। কারণ আজকের রাজনৈতিক ঘটনা ও সুশাসনের চর্চাই ভবিষ্যতে ইতিহাসে পরিণত হয়।
দ্বিতীয়ত, পৌরনীতি তার আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় উপাত্ত ও তথ্য ইতিহাস থেকে সংগ্রহ করে। রাষ্ট্রের স্বরূপ, সরকারের প্রকৃতি এবং অতীতের শাসনব্যবস্থা বুঝতে হলে ইতিহাসের সাহায্য নিতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান বা শাসনতান্ত্রিক বিকাশ বুঝতে হলে ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগ এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠ করা অপরিহার্য।
তৃতীয়ত, ইতিহাসের পরিধি অনেক বিস্তৃত এবং এটি প্রধানত বর্ণনামূলক, অন্যদিকে পৌরনীতি অনেকটা তত্ত্ব ও অনুসন্ধানমূলক। ইতিহাস অতীতের স্বৈরাচারী শাসকদের পরিণতি এবং সুশাসনের সুফল বর্ণনা করে বর্তমানের নাগরিককে অনুপ্রাণিত করে এবং সঠিক পথ দেখায়।
অধ্যাপক বার্জেসের মতে, এই দুটি বিষয় পৃথক হয়ে গেলে একটি প্রাণ হারাবে এবং অন্যটি কেবল আলেখ্যায় পরিণত হবে। পরিশেষে বলা যায়, আদর্শ নাগরিক জীবন গঠন এবং রাষ্ট্রকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য ইতিহাস ও পৌরনীতি উভয় বিষয়ের জ্ঞানই অপরিহার্য।