ক.
লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক ছিলেন ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল।
খ.
১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' ব্যবস্থার একটি কঠোর শর্তই হলো 'সূর্যাস্ত আইন'।
এই আইন অনুযায়ী, জমিদারদের বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনের সূর্যাস্তের আগেই সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব কোষাগারে জমা দিতে হতো। নির্দিষ্ট দিনের সূর্যাস্তের মধ্যে রাজস্ব পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে উক্ত জমিদারের জমিদারি বাজেয়াপ্ত করে নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হতো। মূলত সরকারের রাজস্ব আয় নিশ্চিত করতেই এই কঠোর আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল, যা ইতিহাসে 'সূর্যাস্ত আইন' নামে পরিচিত।
গ.
উদ্দীপকে উল্লিখিত জমিদারের নীতির সাথে লর্ড ডালহৌসি প্রবর্তিত 'স্বত্ববিলোপ নীতি' এর সাদৃশ্য রয়েছে।
লর্ড ডালহৌসি ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের জন্য যে আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করেন, তা ইতিহাসে 'স্বত্ববিলোপ নীতি' নামে পরিচিত। এই নীতির মূল কথা ছিল— কোম্পানির আশ্রিত বা অধীনস্থ কোনো দেশীয় রাজ্যের রাজা অপুত্রক (নিজস্ব পুত্রসন্তানহীন) অবস্থায় মারা গেলে, সেই রাজ্যটি সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হবে। এক্ষেত্রে রাজা কোনো দত্তক পুত্র গ্রহণ করতে পারবেন না এবং দত্তক পুত্রের উত্তরাধিকার ব্রিটিশ সরকার কিছুতেই স্বীকার করবে না। এই নীতি প্রয়োগ করে তিনি ঝাঁসি, সাতারা, নাগপুর প্রভৃতি রাজ্য দখল করেছিলেন।
উদ্দীপকে দেখা যায়, বহরমপুরের জমিদার কোনো কৃষক নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলে তার সম্পত্তি দখল করে নিতেন এবং তিনি দত্তক সন্তানের অধিকার স্বীকার করতেন না। জমিদারের অন্যের সম্পত্তি দখল করার এই কৌশলের সাথে লর্ড ডালহৌসির 'স্বত্ববিলোপ নীতি'র হুবহু মিল রয়েছে। কারণ ডালহৌসিও ঠিক একইভাবে দত্তক পুত্রের অধিকার অস্বীকার করে দেশীয় রাজ্যগুলো সাম্রাজ্যভুক্ত করেছিলেন।
ঘ.
উদ্দীপকে উল্লিখিত শাসক অর্থাৎ লর্ড ডালহৌসি চরম সাম্রাজ্যবাদী হলেও তাঁর সংস্কারসমূহ অনেকাংশেই জনকল্যাণমুখী ও আধুনিকতাপূর্ণ ছিল বলে আমি মনে করি। নিচে আমার মতামত বিশ্লেষণ করা হলো:
লর্ড ডালহৌসির মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতে ব্রিটিশ শাসনকে সুদৃঢ় করা এবং কোম্পানির বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল করা। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর প্রবর্তিত সংস্কারগুলো ভারতের সমাজ, শিক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল, যা পরোক্ষভাবে সাধারণ মানুষের কল্যাণ বয়ে আনে।
প্রথমত, শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। তাঁর আমলেই ১৮৫৪ সালে স্যার চার্লস উডের বিখ্যাত 'উডের ডেসপ্যাচ' ($\text{Wood's Despatch}$) বা শিক্ষা নির্দেশিকা প্রকাশিত হয়, যাকে আধুনিক ভারতীয় শিক্ষার মহাসনদ বা ম্যাগনাকার্টা বলা হয়। এর ফলেই প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক কাঠামো তৈরি হয়।
দ্বিতীয়ত, যোগাযোগ ব্যবস্থায় তাঁর সংস্কার ছিল অভাবনীয়। ১৮৫৩ সালে তাঁর উদ্যোগেই ভারতবর্ষে প্রথম রেলপথ স্থাপিত হয়। এছাড়া তিনি ডাক ও তার ($\text{Telegraph}$) বিভাগের ব্যাপক উন্নয়ন করেন এবং আধ-আনা ভাড়ায় চিঠিপত্র আদান-প্রদান চালু করেন। এর ফলে সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও যোগাযোগে নবযুগের সূচনা হয়।
তৃতীয়ত, তিনি জনকল্যাণে আলাদা 'পূর্ত বিভাগ' ($\text{Public Works Department}$) প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে রাস্তাঘাট মেরামত (যেমন- গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড), গঙ্গা খাল খনন এবং সেচ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। এছাড়া তিনি কন্যাশিশু হত্যা বন্ধ এবং হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন পাসেরও প্রাথমিক উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
পরিশেষে বলা যায়, যদিও লর্ড ডালহৌসির সাম্রাজ্যবাদী নীতি (যেমন- স্বত্ববিলোপ নীতি) ভারতীয়দের মনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল এবং ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের অন্যতম কারণ ছিল, কিন্তু তাঁর শিক্ষা, যোগাযোগ ও সমাজ সংস্কারমূলক কাজগুলো ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষের প্রভূত কল্যাণ সাধন করেছিল এবং আধুনিক ভারতের ভিত্তি রচনা করেছিল। তাই তাঁর সংস্কারসমূহকে জনকল্যাণমুখী বলা সম্পূর্ণ যৌক্তিক।