ক.
বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয় ১৯১১ সালে।
খ.
কোম্পানি শাসনামলের শুরুর দিকে বাংলার শাসনভার সংক্রান্ত দায়িত্ব দুটি পৃথক কর্তৃপক্ষের হাতে ন্যস্ত করাই হলো দ্বৈতশাসন।
১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের (রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা) পর লর্ড ক্লাইভ বাংলায় দ্বৈতশাসন প্রবর্তন করেন। দ্বৈতশাসনের অর্থ হলো দু'জনের শাসনব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, ফৌজদারি বিচার, শান্তিরক্ষা, দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় বাংলার নামমাত্র নবাবের হাতে । অন্যদিকে, বাংলার রাজস্ব আদায়, দেওয়ানি ও জমির বিবাদ সম্পর্কিত বিচার ইত্যাদি লাভজনক কাজ কোম্পানি নিজের হাতে রাখে। বলা হয়, দ্বৈতশাসন ব্যবস্থায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি লাভ করে দায়িত্বহীন ক্ষমতা আর অন্যদিকে নবাব পান ক্ষমতাহীন দায়িত্ব।
গ.
উদ্দীপকে উল্লেখিত যুদ্ধে তথা পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ- দৌলা সিংহাসনচ্যুত হয়েছিলেন।
উদ্দীপকে বলা হয়েছে, বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আসা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষের শাসকদের অদক্ষতা বোঝতে পেরে শাসন ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ১৭৫৭ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ভারতের শাসন ক্ষমতা দখল করে প্রায় ২০০ বছর শাসনকার্য চালায় । এখানে ১৭৫৭ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বলতে পলাশীর যুদ্ধকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। উক্ত যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রয়েছে সিংহাসন নিয়ে নবাব পরিবারের অন্তর্দ্বন্দ্ব, রাজসভাসদ ও ইংরেজদের ষড়যন্ত্র ছিল 'পলাশীর যুদ্ধের প্রেক্ষাপট।
১৭৫৬ সালে নবাব আলীবাদী খানের মৃত্যুর পর নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা বাংলার মসনদে আরোহণ করেন। সিংহাসনে বসেই তিনি খালা ঘসেটি বেগম এবং খালাতো ভাই পুর্নিয়ার শাসনকর্তা শওকত জং-এর ষড়যন্ত্রের শিকার হন । তারা নবাবকে হটাতে ইংরেজদের সাথে ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়ে। নবাবের সহচরদের মধ্যে রাজবল্লভ, রায়দুর্লভ, জগৎশেঠ, ইয়ার লতিফ, উমিচাঁদ, মানিক চাঁদ ও প্রধান সেনাপতি মীরজাফর এ ষড়যন্ত্রে যোগ দেন। ইংরেজ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ এই ষড়যন্ত্রে সফল হন। মীরজাফর নবাবির বিনিময়ে ইংরেজদেরকে পৌনে দুই কোটি টাকা পুরস্কার দিতে রাজি হন। এ ব্যাপারে ক্লাইভ, মীরজাফর, জগৎশেঠ ও উমিচাঁদের মধ্যে গোপন চুক্তি হয়। রবার্ট ক্লাইভ নবাবের বিরুদ্ধে সন্ধি ভঙ্গের মিথ্যা অভিযোগ এনে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন নবাবের বাহিনী ও ইংরেজ বাহিনী ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশী প্রান্তরে মুখোমুখি হয়। তবে প্রধান সেনাপতি মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে এ যুদ্ধে নবাবের পরাজয় ঘটে। মীরজাফর যুদ্ধক্ষেত্র নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন। আর তারই পরামর্শে নবাব যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। যুদ্ধবিরতির সময় ইংরেজরা অপ্রস্তুত নবাব বাহিনীকে আকস্মিক আক্রমণ করে। ফলে সিরাজ-উদ-দৌলার পতন ঘটে।
ঘ.
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা খারপ ছিল।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শোষণ, নির্যাতন, কুশাসন, লুণ্ঠন প্রভৃতির ফলে বাংলার জনগণের অর্থনৈতিক জীবন ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কোম্পানির রাজস্ব আদায়কারী ঠিকাদারদের অত্যাচারে বাংলা জনগণের আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে। এর ফলে বাংলা কৃষক সমাজ সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। শিল্প-বিপ্লবের পর ব্রিটেনে বড় বড় শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে। এসব শিল্প কারখানার কাঁচামাল যেত ভারতবর্ষ থেকে। বিনিময়ে ব্রিটেনের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী ভারতে আসতো। এর ফলে ভারতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প ধ্বংস হয়ে যায়। এসব কুটির ও হস্তশিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট কারিগরগোষ্ঠীও ধ্বংস হয়ে যায়। এভাবে বাংলার কৃষক সমাজ অর্থনৈতিক দিক থেকে পঙ্গু, রিক্ত ও নিঃস্ব হয়ে যায়।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে বাংলা তথা সমগ্র ভারতবর্ষে একটি অসম সামাজিক অবস্থার সৃষ্টি হয়। ভারতবর্ষের হিন্দু জনগণের মধ্যে ধীরে ধীরে একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠে। আর মুসলমানরা ইংরেজি ভাষা ও পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষালাভ থেকে বিরত থাকায় সামাজিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়ে। ফার্সির পরিবর্তে অফিস-আদালতের ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার শুরু হলে মুসলমানরা চাকরি ও অন্যান্য সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি হারায়। কোম্পানির শাসনামলে মুসলমানরা তাদের হারানো ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্নভাবে প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। এই সুযোগে ইংরেজরা হিন্দু জনগণকে শিক্ষা- দীক্ষায় উন্নত করে একটি অনুগত শ্রেণি গড়ে তোলে। এভাবে ইংরেজরা বাংলা তথা ভারতবর্ষে অস্থিতিশীল সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলে।