(ক)
যে শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপ্রধান জনগণের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হন, তাকে প্রজাতন্ত্র বলে।
(খ)
সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নেতৃত্ব হলো নেতার সেই সামাজিক গুণাবলি যা অন্য ব্যক্তিকে প্রভাবিত ও পরিচালিত করে অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে। বর্তমান সময়ে রাষ্ট্রের অভীষ্ট লক্ষ্য হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
একটি সমস্যা ও সংকটে জর্জরিত সমাজ ও রাষ্ট্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে যোগ্য নেতৃত্বের প্রয়োজন। তথ্যের অবাধ প্রবাহ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করার মতো সুশাসনের উপাদানগুলো নেতৃত্বের সদিচ্ছার মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলো দক্ষ নেতৃত্বের গুণেই সুনিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালিত হয়। সুতরাং, সঠিক দিকনির্দেশনা ও দক্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমেই একটি রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়।
(গ)
উদ্দীপকে বর্ণিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের ধরন হলো সম্মোহনী নেতৃত্ব (Charismatic Leadership)।
কোনো নেতা যখন তার ব্যক্তিগত গুণাবলি, ব্যক্তিত্ব এবং কাজের মাধ্যমে জনগণকে ব্যাপকভাবে মুগ্ধ, অনুপ্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হন, তখন তার নেতৃত্বকে সম্মোহনী বা জাদুকরী নেতৃত্ব বলা হয়। 'সম্মোহন' শব্দটির অর্থ হলো আকৃষ্ট করার বিশেষ গুণ। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber) সর্বপ্রথম এই নেতৃত্বের ধারণা প্রদান করেন।
উদ্দীপকে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেওয়ার পর বাঙালি জাতি যাদুমন্ত্রের ন্যায় প্রভাবিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে, বঙ্গবন্ধুর মধ্যে এমন এক সম্মোহনী শক্তি ছিল যা কোটি কোটি মানুষকে একই লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিল। তাঁর ব্যক্তিত্ব, বাগ্মিতা এবং দেশপ্রেমের প্রতি অটল বিশ্বাস জনগণকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
সুতরাং, উদ্দীপকের আলোকে বলা যায় যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও সম্মোহনী গুণের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যা পাঠ্যবইয়ের সম্মোহনী নেতৃত্বের সংজ্ঞার সাথে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ।
(ঘ)
জাতীয় ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম।
জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বলতে বোঝায় একটি জাতির মধ্যে ভাষা, সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং চিন্তা-চেতনার মিলবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। কোনো জাতিকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিতে হলে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই এবং এই ঐক্য স্থাপনে নেতৃত্বের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
বাঙালি জাতিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ভাষণ ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। তৎকালীন সংকটময় পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু এই ভাষণের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার ডাক দেন এবং মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে আহ্বান জানান। ভাষণে তিনি পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ, বঞ্চনা ও নিপীড়নের কথা তুলে ধরে পরাধীনতার বেড়াজাল ছিন্ন করতে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
এই ভাষণের মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধু প্রতিরোধ সংগ্রাম, যুদ্ধের কলা-কৌশল এবং শত্রু মোকাবিলার উপায় সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয় এবং মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই জাতীয় সংহতির ফলেই দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
পরিশেষে বলা যায়, ৭ই মার্চের ভাষণ কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না, বরং এটি ছিল বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় ও মুক্তির সনদ। এই ভাষণ বাঙালি জাতিকে মন্ত্রমুগ্ধ করে স্বাধীনতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করেছিল, যা জাতীয় সংহতির এক অনন্য উদাহরণ।