ক.
১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের পর লর্ড ক্লাইভ বাংলা প্রদেশকে শাসন করার যে নীতি গ্রহণ করেন তা-ই দ্বৈত শাসন নামে পরিচিত।
খ.
পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও উর্দুকে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করার প্রতিবাদে এবং বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টির পর থেকেই বাঙালিরা ভাষাকেন্দ্রিক বৈষম্যের শিকার হয়। এ সময় পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫৬.৪০ ভাগের মাতৃভাষা ছিল বাংলা এবং মাত্র ৩.২৭ ভাগ লোকের ভাষা ছিল উর্দু। কিন্তু দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং উর্দুভাষী বুদ্ধিজীবীরা বাংলাকে উপেক্ষা করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। আর এ কারণেই পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলন সংঘটিত হয়।
গ.
উল্লিখিত তথ্যটি আমার পাঠ্যবইয়ের মুজিবনগর সরকারকে নির্দেশ করে।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলের ঘোষণা অনুযায়ী স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের 'প্রবাসী সরকার' গঠন করা হয় যা মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত। এ সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । এছাড়া উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থমন্ত্রী ছিলেন ক্যাপ্টেন (অব.) মনসুর আলী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন এ এইচ এম কামারুজ্জামান।
উদ্দীপকে বর্ণিত মুজিবনগর সরকার গঠনের প্রেক্ষাপটের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার কথা প্রচার হওয়ার পর ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিরোধ করার কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটে। প্রাথমিক প্রতিরোধের পর পাকিস্তানি বাহিনীর প্রবল আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্ত শহর ও প্রত্যন্ত এলাকাসমূহে অবস্থান নেয়। সেই সঙ্গে দেশের অসংখ্য মানুষ পাকিস্তানি হামলা থেকে প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পার হয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় নিতে থাকে। এমন প্রেক্ষাপটেই : মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ সরকারের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রথম সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা গ্রামে আওয়ামী লীগের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের দ্বারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা আদেশ জারি করা হয় । এ ঘোষণা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ও সশস্ত্র বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়। বাংলাদেশের প্রথম এ অস্থায়ী সরকার 'মুজিবনগর সরকার' বা প্রবাসী সরকার নামেও অভিহিত হয়। ১৭ এপ্রিল, তারিখে মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে।
ঘ.
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে উক্ত সরকারের অর্থাৎ মুজিবনগর সরকারের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়। পরে এলাকাটির নাম হয় মুজিবনগর। এ কারণে ইতিহাসে এই অস্থায়ী সরকার মুজিবনগর সরকার' নামে পরিচিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মুজিবনগর সরকার গঠন ছিল একটি যুগান্তকারী ঐতিহাসিক ঘটনা। কেননা এই সরকারই মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পথকে সুগম করেছিল।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ায় বাংলার স্বাধীনতাকামী জনতা আশার আলো দেখতে পায়। এ সরকার ভারতের সহায়তায় ছাত্রসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধের ময়দানে পাঠায়। সংগ্রামী জনগণের মনোবল ঠিক রাখতে মুজিবনগর সরকার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। এগুলো মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিদের প্রেরণার অন্যতম উৎস ছিল। এ সরকার মুক্তিযুদ্ধকে সুসংহতভাবে পরিচালনার জন্য সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে। মুজিবনগর সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা ছিল কলকাতা, দিল্লি, লন্ডন, ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক ও স্টকহোমসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী ও প্রধান শহরে বাংলাদেশ সরকারের মিশন স্থাপন এবং সব স্থানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি নিয়োগ করে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে প্রচারণা ও সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করা।
উপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, মুজিবনগর সরকার মুক্তিযুদ্ধকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা, মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা দান, কূটনৈতিক তৎপরতাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলি সম্পাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল।