ক.
আলীবর্দী খান বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব ছিলেন এবং সম্পর্কে নবাব সিরজউদ্দৌলার নানা ছিলেন।
খ.
১৯৬৪ সালের ২২ অক্টোবর বক্সারের প্রান্তরে বাংলা স্বাধীনচেতা নবাব মীর কাসিম ও ইংরেজ বাহিনীর মধ্যে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় ইতিহাসে সেটিই বক্সারের যুদ্ধ নামে পরিচিত। উপমহাদেশে ব্রিটিশ শক্তির উত্থানে এবং তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধিতে বক্সারের যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। এ যুদ্ধের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি লাভকরে। ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
গ.
উদ্দীপকে ১১৭৬ বঙ্গাব্দে অর্থাৎ ১৭৭০ সালে বাংলার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
১৭৬৫ সালে লর্ড ক্লাইভ দ্বৈত শাসনব্যবস্থা চালু করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল কোম্পানিকে শক্তিশালী করে নবাবকে ক্ষমতাহীন করা। দ্বৈত শাসনব্যবস্থার ফলে নবাব পায় ক্ষমতাহীন দায়িত্ব আর কোম্পানি পায় দায়িত্বহীন ক্ষমতা। কোম্পানি রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা লাভের 'ফলে জনগণের উপর নেমে আসে ব্যাপক নির্যাতন। তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য রাজস্ব আদায় করতেন। এই সময় পর পর দুই বছর খরায় কৃষকদের ফসল উৎপাদন কমে গেলেও কোম্পানি তার রাজস্ব আদায় বন্ধ করেনি। আবার দেখা যেতো সে রাজস্বের টাকা শাসনকার্যে ইংরেজরা নবাবকে ঠিকভাবে না দেওয়ার ফলে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এই অদ্ভূত পরিস্থিতিতে জনগণের উপর নেমে আসে অমানুষিক দুঃখ দুর্দশা। ফলে ১১৭৬ বঙ্গাব্দে, ১৭৭০ সালে বাংলায় এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যা ইতিহাসে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত। এ দুর্ভিক্ষে বাংলার জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ মারা যায়। দেশে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই বৃদ্ধি পেয়ে জনমনে চরম অরাজকতা ও নিরাপত্তাহীনতা নেমে আসে।
অন্যদিকে উদ্দীপকে রকিব রঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দ মঠ উপন্যাসে বাংলায় সংঘটিত একটি দুর্ভিক্ষের কথা জানতে পারে। মূলত ক্ষমতাহীন নবাবের শাসন ও বিদেশি হস্তক্ষেপের ফলে ও তাদের লুটপাটের ফলে এই দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয়। এই দুর্ভিক্ষে প্রায় ১ কোটি মানুষ খাবরের অভাবে মারা যায়, যা সমগ্র বাংলার জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ।' উদ্দীপকের বর্ণিত দুর্ভিক্ষ ও আমার পঠিত দুর্ভিক্ষ, ছিয়াত্তরের মন্বন্তর একই চিত্রে প্রতিফলিত হয়েছে।
সুতরাং বলা যায়, নিঃসন্দেহে উদ্দীপকে বাংলায় সংঘটিত ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
ঘ.
১৭৭০ সালে বাংলায় সংঘটিত ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ তথা ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের ফলে বাংলার সমাজ, অর্থনীতি এবং জনসংখ্যার ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসে। এই দুর্ভিক্ষের ফলাফল ছিল ব্যাপক ও বিস্তৃত।
১৭৭০ সালে সংঘটিত মহা দুর্ভিক্ষের ফলে প্রায় ১ কোটি মানুষ অনাহারে মারা যায়। যা বাংলার মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। গ্রামগুলো জনশূন্য হয়ে পড়ে। বহু কৃষকশ্রমিক মারা যায় ফলে কৃষিকাজ ও উৎপাদন ধ্বংসের মুখে পড়ে যায়। খাদ্য উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যায়, জমির উর্বরতা নষ্ট হয় এবং কৃষকদের মধ্যে চাষাবাদের অনীহা সৃষ্টি হয়। অনেক কৃষক ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে জমি ছেড়ে পালিয়ে যায়। দেওয়ানি শাসনের অবসান ঘটে এই দুর্ভিক্ষের ফলে। কেননা দুর্ভিক্ষে কোম্পানির রাজস্ব আয় কমে যায়। বাণিজ্য মন্দা দেখা দেয়। তাই ইংল্যান্ডের পরিচালক সভা কোম্পানির স্বার্থ রক্ষার জন্য ও বাংলার কৃষিশিল্পকে রক্ষার জন্য দ্বৈত শাসনব্যবস্থার লোপ করার সিদ্ধান্ত নেন। ওয়ারেন হেস্টিংকে নির্দেশ দেওয়া হয় কোম্পানি যেন এখন থেকে বাংলার রাজস্ব ও শাসনের প্রত্যক্ষ দায়িত্ব গ্রহণ করে। জনগণের ওপর নেমে আসা দুর্ভিক্ষের জন্য ইংরেজরা এ সময় কিছু প্রশাসনিক সংস্কার করে। যাতে করে এই দুর্ভিক্ষ থেকে দীর্ঘ মেয়াদে উত্তরণ হতে পারে। দুর্ভিক্ষের ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। খাদ্যের অভাবে মানুষ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই এর দিকে ঝুঁকে পড়ে। ধনী ব্যবসায়ীরা দুর্ভিক্ষের সুযোগে খাদ্য মজুদ শুরু করে, যার ফলে ব্যাপক খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শোষণমূলক নীতি ও প্রাকৃতিক কারণে সংঘটিত এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের ফলে বাংলার অর্থনীতি, সমাজ ও জনসংখ্যার ওপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।