(ক)
অধিকার প্রধানত দুই প্রকার। যথা: ১. নৈতিক অধিকার এবং ২. আইনগত অধিকার।
(খ)
সামাজিক কর্তব্য বলতে বোঝায় সমাজের প্রতি একজন নাগরিকের দায়িত্ব বা কর্তব্য। সমাজজীবনকে সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার জন্য মানুষের যে সকল দায়িত্ব পালন করতে হয়, তাকেই সামাজিক কর্তব্য বলা হয়। যেমন: সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা, সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও পরিচালনা করা, সন্তানদের সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা। ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য সামাজিক কর্তব্য পালন অপরিহার্য।
(গ)
মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকারের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. উৎসের পার্থক্য: মৌলিক অধিকারের উৎস হলো রাষ্ট্রের সংবিধান, অন্যদিকে মানবাধিকারের উৎস হলো জাতিসংঘ।
২. পরিধির পার্থক্য: মৌলিক অধিকারের পরিধি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ, কিন্তু মানবাধিকারের পরিধি বিশ্বব্যাপী বা অসীম।
৩. প্রকৃতির পার্থক্য: মৌলিক অধিকার হলো রাষ্ট্রীয় অধিকার, আর মানবাধিকার হলো আন্তর্জাতিক অধিকার।
৪. বিকাশের পার্থক্য: রাষ্ট্রীয় চেতনাবোধ থেকে মৌলিক অধিকারের বিকাশ ঘটে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চেতনাবোধ থেকে মানবাধিকারের বিকাশ হয়েছে।
৫. কার্যকারিতার পার্থক্য: মৌলিক অধিকার সাধারণত দ্রুত ও সহজে কার্যকর করা যায়, কিন্তু মানবাধিকার ততটা সহজে কার্যকর করা যায় না।
৬. সুনির্দিষ্টতার পার্থক্য: মৌলিক অধিকার অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট, কিন্তু মানবাধিকার ততটা সুনির্দিষ্ট নয়।
৭. রক্ষকের পার্থক্য: মৌলিক অধিকারের রক্ষক হলো রাষ্ট্র ও সংবিধান, আর মানবাধিকারের রক্ষক হলো জাতিসংঘ।
৮. আশ্রয়ের পার্থক্য: মৌলিক অধিকারের ভিত্তিতে একজন ব্যক্তি অন্য রাষ্ট্রের আশ্রয় লাভ করতে পারে না, তবে মানবাধিকারের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি নিজ রাষ্ট্রে নিরাপদ বোধ না করলে অন্য রাষ্ট্রের আশ্রয় পেতে পারে।
(ঘ)
উদ্দীপকে প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান সুইডেন ও নরওয়ের নাগরিকদের অধিকার সচেতনতা ও কর্তব্যবোধ দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। তাঁর এই ধারণা যে মানুষ অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হবে, তা নির্দেশ করে যে অধিকার ও কর্তব্য একে অপরের পরিপূরক। অর্থাৎ, অধিকারের মধ্যেই কর্তব্য নিহিত রয়েছে।
অধিকার ও কর্তব্যের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। একজনের অধিকার ভোগ করার অর্থ হলো অন্য ব্যক্তির সেই অধিকারটি রক্ষা করার কর্তব্য পালন করা। অর্থাৎ, আমার অধিকার অন্যের কর্তব্য, আবার অন্যের অধিকার আমার কর্তব্য। উদাহরণস্বরূপ, আমার বেঁচে থাকার অধিকার থাকলে, অন্যের কর্তব্য হলো আমাকে হত্যা না করা। একইভাবে, অন্যের বেঁচে থাকার অধিকার রক্ষায় আমার কর্তব্য হলো তার পথে কোনো বাধা সৃষ্টি না করা।
যদি অধিকার অবাধ ও সীমাহীন হয় এবং কর্তব্যের কোনো স্থান না থাকে, তবে সমাজে স্বেচ্ছাচারিতার জন্ম হবে। এতে কেবল সবল ব্যক্তিরা অধিকার ভোগ করবে এবং দুর্বলরা বঞ্চিত হবে। তাই সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখতে অধিকারের সাথে কর্তব্যের সমন্বয় প্রয়োজন।
রাষ্ট্র নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করে এবং বিনিময়ে নাগরিকরা রাষ্ট্রের প্রতি তাদের কর্তব্য পালন করে। নাগরিকের যা কর্তব্য, রাষ্ট্রের তা অধিকার; আবার রাষ্ট্রের যা কর্তব্য, নাগরিকের তা অধিকার। কার্ল মার্কসের ভাষায়, "কর্তব্য ছাড়া কোনো অধিকার নেই আর অধিকার ছাড়া কোনো কর্তব্য নেই।"
সুতরাং, উদ্দীপকের আলোকে বলা যায় যে, অধিকার ও কর্তব্য মুদ্রার দুটি পিঠের মতো। অধিকার সচেতনতা তখনই সার্থক হয় যখন তার সাথে কর্তব্যবোধ যুক্ত থাকে। তাই অধিকারের মধ্যেই কর্তব্য নিহিত রয়েছে।