(ক)
কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার সকল সজীব উপাদান এবং তাদের সাথে ওই স্থানের পরিবেশের সকল অজীব উপাদানের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে যে স্বয়ংক্রিয় ও সুসংগঠিত ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তাকে বাস্তুসংস্থান বা ইকোসিস্টেম বলে।
(খ)
উদ্ভিদ ও প্রাণীর স্থানিক ভিন্নতার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারকারী প্রধান কারণসমূহ নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. ভৌগোলিক অবস্থান ও ভূপ্রকৃতি: কোনো অঞ্চলের অক্ষাংশ, উচ্চতা এবং সমুদ্র থেকে দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে জলবায়ুর তারতম্য ঘটে, যা উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিস্তারে সরাসরি প্রভাব ফেলে। পর্বত, মালভূমি বা সমতল ভূমির ভিন্নতা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী দেখা যায়।
২. জলবায়ু: তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত উদ্ভিদ ও প্রাণীর বৈচিত্র্য নির্ধারণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। অধিক বৃষ্টিপাত ও উষ্ণ অঞ্চলে চিরসবুজ বনভূমি ও বৈচিত্র্যময় প্রাণী দেখা যায়, অন্যদিকে শুষ্ক বা শীতল অঞ্চলে ভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণী অভিযোজিত হয়।
৩. মৃত্তিকার বৈশিষ্ট্য: মৃত্তিকার গঠন, পুষ্টি উপাদান, আর্দ্রতা ও অম্লত্বের ওপর ভিত্তি করে উদ্ভিদের ধরন নির্ধারিত হয়। আর উদ্ভিদের ধরনের ওপর নির্ভর করে ওই অঞ্চলের প্রাণীকুল।
৪. মানুষের হস্তক্ষেপ: অনেক ক্ষেত্রে মানুষের বসতি স্থাপন, বন উজাড় ও নগরায়ণের ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ পরিবর্তিত হয়, যা উদ্ভিদ ও প্রাণীর স্বাভাবিক বিস্তারে বাধা সৃষ্টি করে।
(গ)
উদ্দীপকে তিহামের এলাকার বর্ণনা অনুযায়ী, তার এলাকাটি প্লাইস্টোসিন কালের সোপান বা সোপান ভূমির অন্তর্গত। বাংলাদেশের মধুপুর, ভাওয়াল ও বরেন্দ্র অঞ্চল এই সোপান ভূমির অন্তর্ভুক্ত। এই অঞ্চলে মূলত ক্রান্তীয় পাতাঝরা বৃক্ষের বনভূমি গড়ে উঠেছে। এই বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের বৈশিষ্ট্য নিচে দেওয়া হলো:
১. উদ্ভিদের ধরন: শীতকালে শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে এই বনাঞ্চলের বৃক্ষগুলোর পাতা ঝরে যায়, তাই একে ক্রান্তীয় পাতাঝরা বনভূমি বলা হয়। এখানে প্রধানত শাল, গজারি, কাঁঠাল, নিম, কড়ই, ছাতিম, হরিতকি ও বহেরা জাতীয় বৃক্ষ জন্মে।
২. মৃত্তিকার প্রভাব: এই অঞ্চলের মৃত্তিকা সাধারণত লালচে ও কংকরময় এবং লৌহজাত পদার্থ সমৃদ্ধ। এই ধরনের আঁটসাট মৃত্তিকা ও জলবায়ু শাল ও গজারি গাছের বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
৩. প্রাণিকুল: এই বনাঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির বানর, শিয়াল, বনবিড়াল এবং নানা ধরনের পাখি ও সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী দেখা যায়।
সামগ্রিকভাবে, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ও বিশেষ মৃত্তিকা গঠনের কারণে তিহামের এলাকার বনাঞ্চলটি একটি নির্দিষ্ট ধরনের জীববৈচিত্র্য ধারণ করে, যা অন্যান্য অঞ্চলের বনভূমি থেকে আলাদা।
(ঘ)
উদ্দীপকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বনভূমি বলতে সুন্দরবন বা স্রোতজ বনভূমিকে বোঝানো হয়েছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় এই বায়োমের গুরুত্ব অপরিসীম:
১. প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধ: সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জন্য একটি প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। বঙ্গোপসাগর থেকে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের গতিবেগ এই বিশাল বনভূমি বাধাগ্রস্ত করে, ফলে দেশের মূল ভূখণ্ড জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পায়।
২. ভূমিক্ষয় ও তীরভাঙ্গন রোধ: স্রোতজ বনভূমির শ্বাসমূল ও ঠেসমূল মাটিকে শক্তভাবে ধরে রাখে। এর ফলে সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার তীব্র স্রোত থেকে উপকূলীয় ভূমিক্ষয় ও নদীভাঙন অনেকাংশে হ্রাস পায়।
৩. বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য: এই বনভূমি অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল। এটি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন সরবরাহ করে বৈশ্বিক জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
৪. জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ: সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বা স্রোতজ উদ্ভিদসমূহ এবং এর সাথে সম্পর্কিত জলজ ও স্থলজ প্রাণীকুল একটি জটিল খাদ্যশৃঙ্খল তৈরি করে, যা উপকূলীয় অঞ্চলের সামগ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে।
উপসংহারে বলা যায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই স্রোতজ বনভূমি কেবল একটি সম্পদ নয়, বরং এটি উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষার প্রধান রক্ষাকবচ। তাই প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় এই বায়োমের গুরুত্ব অপরিসীম।