
(ক)
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন।
(খ)
১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে যে গণআন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল তা ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান নামে পরিচিত।
আইয়ুব খানের দীর্ঘ দশ বছরের স্বৈরশাসন পূর্ব পাকিস্তানিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা ঘোষণা করলে আইয়ুব খান এই আন্দোলন দমন করার জন্য বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করেন। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র গণবিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এই সময়ে ছাত্রসমাজ ১১ দফা দাবি নিয়ে সামনে এলে গণবিক্ষোভ এক গণবিস্ফোরণে পরিণত হয়। আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে এই তীব্র গণআন্দোলনই ইতিহাসে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান নামে পরিচিত।
(গ)
উদ্দীপকের চিত্রগুলো আমাদের জাতীয় জীবনের অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ২৫ মার্চের কালরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে ২৫ মার্চের কালরাত এক কলঙ্কিত অধ্যায়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সেনারা পূর্ব পাকিস্তানের ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র মানুষের ওপর এক বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালায়। নির্বিচারে গণহত্যা ছাড়াও গোলাবর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে ঢাকাকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করা হয়। উদ্দীপকের চিত্রে এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের প্রতিফলন ঘটেছে।
প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বর্বর পাকবাহিনী বাঙালির ন্যায্য দাবিকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্যে অমানবিক অত্যাচার চালায়। এই হত্যাযজ্ঞের নীল নকশা তৈরি করেছিল টিক্কা খান এবং রাও ফরমান আলি। এই ঘৃণ্য নকশা বাস্তবায়নের জন্য তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল, পুলিশ লাইনসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে আক্রমণ চালায়। সে রাতে নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হয় প্রতিবাদী জনতা, পথচারী ও বস্তিবাসীরা। দেশি-বিদেশি সূত্র মতে, ২৫ মার্চ রাতে শুধু ঢাকায় প্রায় $7,000$ মানুষকে হত্যা করা হয়। কোনো কোনো বর্ণনা মতে, এই সংখ্যা প্রায় $50,000$। এছাড়া দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদসহ কয়েকটি সংবাদপত্র অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়। নৃশংস এই গণহত্যার সংবাদ যেন বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য হানাদার বাহিনী ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ২৫ জন বিদেশি সাংবাদিককে আটকে রাখে। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকের চিত্রে ২৫ মার্চ রাতের সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে।
(ঘ)
উদ্দীপকের ঘটনা তথা ২৫ মার্চের গণহত্যা আমাদের স্বাধীনতার পথকে ত্বরান্বিত করেছিল, উক্তিটি যথার্থ।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ ও নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের ওপর যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়, তা ছিল ইতিহাসের অন্যতম এক নারকীয় ঘটনা। এই বীভৎসতা বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে চূড়ান্ত অনুপ্রেরণা জোগায়। বাঙালি জাতি এই গণহত্যার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করে, যা স্বাধীনতা অর্জনের পথকে সুপ্রশস্ত করে।
পাকিস্তানি বাহিনীর 'অপারেশন সার্চলাইট' বা কালরাতের হত্যাকাণ্ড বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিল। ২৫ মার্চ রাতে পাক বাহিনী যে মানবেতর তাণ্ডবলীলা শুরু করে তা পরবর্তী ৩৬ ঘণ্টা অব্যাহত রাখে। এই শোককে শক্তিতে পরিণত করে বাঙালি জাতি শুরু করে মুক্তির সংগ্রাম। ২৫ মার্চের গণহত্যার সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে বিভিন্ন স্থানে কর্মরত ইপিআর, সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্যরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কোনো রকম পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই ছাত্রজনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। শুরু হয় পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালি পুলিশ, আনসার ও সাধারণ মানুষের এক অসম লড়াই, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ নামে পরিচিত।
দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালিরা এদেশকে পাকিস্তানিদের কবল থেকে মুক্ত করে। বাঙালির অসীম সাহস, দৃঢ় সংকল্প আর অপরিমেয় আত্মত্যাগে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে এবং বিশ্ব মানচিত্রে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্থান পায়।
সার্বিক আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, ২৫ মার্চের কালরাতের গণহত্যা বাঙালিকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিতে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছিল। বস্তুত এই গণহত্যার পর বাঙালির সামনে স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না। সুতরাং ২৫ মার্চের ঘটনা এদেশের স্বাধীনতার পথকে ত্বরান্বিত করেছিল।