(ক)
আমলাতন্ত্রের অপর নাম হলো 'টেবিলনির্ভর শাসন' বা 'দপ্তরনির্ভর শাসন'।
(খ)
লালফিতার দৌরাত্ম্য বলতে প্রশাসনিক কাজে অহেতুক আনুষ্ঠানিকতা, নিয়মনীতির কঠোরতা এবং দীর্ঘসূত্রতাকে বোঝায়। সপ্তদশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে সরকারি ফাইলগুলো লাল রঙের ফিতায় বেঁধে রাখা হতো, যা বর্তমানে নিয়মের কড়াকড়িতে কাজ থমকে থাকা বা অহেতুক সময়ক্ষেপণের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর ফলে সেবাগ্রহীতারা হয়রানির শিকার হন এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না।
(গ)
উদ্দীপকে উল্লিখিত অনন্যা রহমানের মতো নিয়োগপ্রাপ্তদের একত্রে আমলাতন্ত্র বলা হয়। আমলাতন্ত্র হলো শাসন বিভাগের স্থায়ী, দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মচারীবৃন্দের একটি সমন্বিত রূপ।
আমলাতন্ত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. পদসোপান নীতি: আমলাতন্ত্রে পদের গুরুত্ব ও মর্যাদা অনুসারে পর্যায়ক্রমে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। প্রতিটি নিম্নতর পদ উচ্চতর পদ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং নিম্নপদস্থরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকেন।
২. সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি: আমলাতন্ত্র সুনির্দিষ্ট লিখিত আইন ও নিয়মাবলি অনুসরণ করে পরিচালিত হয়।
৩. পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা: আমলারা মেধা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তারা রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থেকে পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেন এবং দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে থাকেন।
৪. স্থায়িত্ব: আমলারা সাধারণত স্থায়ী কর্মচারী, যারা রাষ্ট্র নির্ধারিত বেতন ও সুযোগ-সুবিধা লাভ করেন এবং একটি সুনির্দিষ্ট কর্মজীবন অতিবাহিত করেন।
(ঘ)
উদ্দীপকে বর্ণিত নীতিনির্ধারণে সহায়তা করা ছাড়াও অনন্যা রহমানের মতো আমলাদের রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কাজে বহুমুখী ভূমিকা রয়েছে।
আমলাদের কাজের পরিধি ও গুরুত্ব নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. নীতি বাস্তবায়ন: সরকার কর্তৃক প্রণীত আইন ও জনকল্যাণমূলক নীতিসমূহ মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা আমলাদের অন্যতম প্রধান কাজ। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের সাফল্য অনেকাংশে আমলাদের বাস্তবায়ন দক্ষতার ওপর নির্ভর করে।
২. আইন প্রণয়নে সহায়তা: তাত্ত্বিকভাবে আইন প্রণয়ন রাজনীতিবিদদের কাজ হলেও কারিগরি ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কারণে আমলারা আইনের খসড়া ও নীতি সংক্রান্ত প্রস্তাব তৈরিতে আইনসভাকে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করেন।
৩. বিচারসংক্রান্ত দায়িত্ব: অনেক ক্ষেত্রে আমলারা বিভাগীয় ট্রাইব্যুনাল বা নির্দিষ্ট প্রশাসনিক ক্ষেত্রে আইন মোতাবেক বিরোধ মীমাংসা করে বিচারসংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করেন।
৪. উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড: অনন্যা রহমানের মতো কর্মকর্তারা কৃষি, শিল্প, শিক্ষা ও যোগাযোগ খাতের ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেন।
৫. তথ্য সরবরাহ ও জরুরি সেবা: সরকারি নীতি ও কার্যাবলি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরকার ও জনগণকে সরবরাহ করা এবং জরুরি পরিস্থিতি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
পরিশেষে বলা যায়, আমলারা কেবল নীতিনির্ধারণের উপদেষ্টা নন, বরং আধুনিক গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থার একটি অপরিহার্য স্তম্ভ। অধ্যাপক ফাইনারের মতে, আমলাতন্ত্র ব্যতীত খোদ সরকারব্যবস্থাই অচল হয়ে পড়বে। তাই রাষ্ট্রের সার্বিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও জনসেবা নিশ্চিত করতে তাদের বহুমুখী দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব অপরিসীম।